মানবজাতির ইতিহাসের শুরু থেকেই প্রতিটি সমাজে এমন কিছু মানুষ ছিলেন, যাঁরা রোগের চিকিৎসা এবং শারীরিক সমস্যার সমাধানে দক্ষ ছিলেন। তাঁরা মূলত অভিজ্ঞতার মাধ্যমে চিকিৎসাবিদ্যা শিখতেন এবং নিজেদের জ্ঞান ও অর্জিত অভিজ্ঞতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেন। আধুনিক যুগে চিকিৎসাবিদ্যাকে সুসংগঠিত করা এবং চিকিৎসার বিভিন্ন পদ্ধতিতে দক্ষ ব্যক্তিদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ইরানেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের একাডেমিক শিক্ষার ইতিহাস কয়েক শতাব্দী পুরোনো। তবে আধুনিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বয়স ২০০ বছরেরও কম।
সম্ভবত ইরানে আধুনিক পদ্ধতিতে চিকিৎসাবিদ্যার শিক্ষা প্রদানকারী প্রথম প্রতিষ্ঠান ছিল ‘দারুলফুনুন’। ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমকে ইরানে চিকিৎসাবিদ্যার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রথম পর্যায় এবং পরবর্তীকালে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠার সূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। প্রায় ৬০ বছর পর, ১৮১১ খ্রিষ্টাব্দে মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। পরবর্তী সময়ে, কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার পর, ১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে এই স্কুলটি ‘মেডিকেল ফ্যাকাল্টি’ বা চিকিৎসা অনুষদে রূপান্তরিত হয় এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম অনুষদ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকে।
অবশেষে, ১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে চিকিৎসাবিজ্ঞান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক করার পরিকল্পনা অনুমোদিত হওয়ার পর, তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পৃথক হয়ে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে।
তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসের শিক্ষা ও গবেষণা কার্যক্রম
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে এবং এর শিক্ষক ও গবেষক (একাডেমিক) সদস্যের সংখ্যা ১,৮০০-এর বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ১১টি হাসপাতাল ও হাসপাতাল কমপ্লেক্স পরিচালিত হয়। শিশু চিকিৎসা কেন্দ্র এবং তেহরান বিশেষায়িত হৃদ্রোগ কেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি বৃহৎ চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। এসব কেন্দ্রে সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে গবেষণা পরিচালনার পাশাপাশি রোগীদের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবাও প্রদান করা হয়।
তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস থেকে ৬১টি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্রকাশিত হয়। এখন পর্যন্ত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রকাশিত বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের সংখ্যা ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ১১৩টি গবেষণাকেন্দ্র রয়েছে। সব মিলিয়ে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২৯ হাজার গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে।
প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন জরুরি বিভাগগুলোতে প্রায় ১০ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। এখানে প্রতি বছর ১ লাখ ৬০ হাজারেরও বেশি অস্ত্রোপচার করা হয়। এ ছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক ও বহির্বিভাগগুলোতে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন।
খাদ্য ও ওষুধ খাতেও এই বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ খাতে বিশ্ববিদ্যালয়টি ৫২৫টি ফার্মেসি এবং ২৪৩টি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম তদারকি করে। পাশাপাশি, প্রতি বছর ওষুধসংক্রান্ত সেবা গ্রহণের জন্য আসা প্রায় ২০ লাখ মানুষের চাহিদা পূরণ করে।
তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসের কার্যক্রম ও আন্তর্জাতিক অবস্থান
২০২৩ সালে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসে অধ্যয়নরত বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১,৮১৫ জন। বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। প্রতি বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য আবেদন আহ্বান করা হয়।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসকে সাধারণত ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
২০২৩ সালে প্রকাশিত সাংহাই র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, জনস্বাস্থ্য, নার্সিং এবং বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে ২০১–৩০০তম স্থান অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ ছাড়া, ফার্মেসি ও ফার্মাসিউটিক্যাল সায়েন্সেস বিষয়ে ৩০১–৪০০তম স্থান অর্জন করে ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। এই র্যাঙ্কিংয়ে খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে ২০১–৩০০তম স্থান এবং ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও বায়োটেকনোলজি বিষয়ে ৩০১–৪০০তম স্থান অর্জন করেও বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
২০২১ সালে প্রকাশিত ISC র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বিষয়ে ৬০১–৭০০তম স্থান অর্জন করে তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস। কৃষিবিজ্ঞান এবং প্রকৌশল ও প্রযুক্তি এই দুটি ক্ষেত্রে ৪৫১–৫০০তম স্থান অর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে স্থান করে নেয়। এই র্যাঙ্কিং পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বব্যাপী ২২১তম স্থান অর্জন করে এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ভিত্তিক তালিকায় ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান অধিকার করে।
ওয়েবোমেট্রিক্স র্যাঙ্কিংয়েও তেহরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেস বিশ্বব্যাপী ৪৫২তম স্থান অর্জন করে। এই র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের পর এটিকে ইরানের দ্বিতীয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত করা হয়েছে।