ইরানিরা শিল্পপ্রেমী জাতি। অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে শিল্পের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহের প্রকাশ দেখা যায়। ইরানের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোতে রং ও নকশার অপূর্ব সমন্বয়ের মাধ্যমে সৌন্দর্যের অনন্য সব নিদর্শন সৃষ্টি হয়েছে এবং সেখানে অসাধারণ সৌন্দর্যের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার তুলে ধরা হয়েছে।
শিল্পের প্রতি এই ভালোবাসা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ইরানিদের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে সাধারণ পাঠ্যবিষয়ের পাশাপাশি নকশা অঙ্কন ও ক্যালিগ্রাফির মতো শিল্পবিষয়ক শিক্ষাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটি-কেই সম্ভবত ইরানের প্রাচীনতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা যায়, যা একটি শিল্পশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আজও তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটির ইতিহাস
১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে উচ্চতর সংগীত বিদ্যালয় নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। এই সংগীত বিদ্যালয়টি দারুলফুনুনের একটি স্বতন্ত্র বিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হতো। দারুলফুনুন ছিল ইরানের প্রাচীনতম আধুনিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র। এই সংগীত বিদ্যালয়টি মিউজিক স্কুল নামেও পরিচিত ছিল।
১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর একটি শিল্পবিষয়ক উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি গুরুত্ব পায়। এ কারণে ইসলামী বিপ্লবের আগে থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসা পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ছিল:
- ফারাবি বিশ্ববিদ্যালয়
- চারুকলা ও সজ্জাশিল্প অনুষদ
- নাট্যকলা অনুষদ
- উচ্চতর সংগীত বিদ্যালয়
- জাতীয় সংগীত বিদ্যালয়
এভাবে ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে ধরা যায়। অল্প সময়ের একটি স্থবিরতার পর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ববিদ্যালয়টির কার্যক্রম পুনরায় শুরু হয় এবং আজ পর্যন্ত তা অব্যাহত রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে বিভিন্ন নতুন বিষয় চালু হয়েছে এবং এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহু শিক্ষার্থী স্নাতক হয়ে বের হয়েছেন।
১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে প্রয়োগশিল্প, দৃশ্যশিল্প এবং চলচ্চিত্র ও থিয়েটার এই তিনটি অনুষদ এবং ইসফাহানে একটি ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়টির অধিভুক্ত অংশ হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করত। পরবর্তীতে ১৯৯৪ খ্রিস্টাব্দে সংগীত অনুষদ এবং ২০০১ খ্রিস্টাব্দে স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ইসফাহান ক্যাম্পাস স্বায়ত্তশাসন লাভ করে এবং একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিট হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। পরবর্তী বছরগুলোতে সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার এবং তাত্ত্বিক বিজ্ঞান ও উচ্চতর শিল্প অধ্যয়ন অনুষদও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়। এছাড়া ফারাবি আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল স্নাতকোত্তর পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ভবন মাশক স্কয়ার-এ অবস্থিত। এটি তেহরানের অন্যতম প্রাচীন চত্বর, যা বর্তমানে শহরের কেন্দ্রীয় এলাকার একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় ২০০ বছরের পুরোনো এই কমপ্লেক্সে বেশ কয়েকটি জাদুঘর ও প্রশাসনিক কেন্দ্রও অবস্থিত।
তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক ও গবেষণা কার্যক্রম
তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটি প্রতি বছর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভর্তি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে এবং অন্যান্য দেশ থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি করে। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা ব্যবস্থাপনা নামে একটি দপ্তর রয়েছে। এই দপ্তরের দায়িত্ব হলো জ্ঞান ও প্রযুক্তি বিনিময়ের উদ্দেশ্যে অন্যান্য দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন, সম্মেলন আয়োজন এবং যৌথ গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ গবেষণা কার্যক্রমও এর শিক্ষা কার্যক্রমকে সহায়তা করার লক্ষ্যে পরিচালিত হয়। স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনা, দৃশ্য ও প্রয়োগশিল্প এবং নাট্যকলা ও সংগীত এই ক্ষেত্রগুলোতে তিনটি বৈজ্ঞানিক সাময়িকী প্রকাশ করা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম গবেষণা কার্যক্রম। এখন পর্যন্ত এই তিনটি সাময়িকীর বিভিন্ন সংখ্যায় মোট ১,১০০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে।
তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটির অন্যতম গবেষণা বিভাগ সমাজের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক-শৈল্পিক সহযোগিতা। এই বিভাগটি ২০১৭ খ্রিস্টাব্দে কার্যক্রম শুরু করে। এই বিভাগের প্রধান লক্ষ্য হলো সমাজ ও শিল্পখাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক কার্যক্রম এবং প্রয়োগমূলক শিল্প গবেষণায় সহায়তা করা।
তেহরান আর্ট ইউনিভার্সিটির উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন কেন্দ্র-এর কার্যক্রমও বিশ্ববিদ্যালয়টির একটি উল্লেখযোগ্য দিক। এটি শিল্পক্ষেত্রের উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখার অন্যতম মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হয়। কেন্দ্রটি ২০২০ সাল থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে।
এই কেন্দ্রের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর মধ্যে রয়েছে গবেষণা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে নতুন ধারণা ও স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করা, উদ্ভাবন ও পেটেন্টের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বৈজ্ঞানিক, কারিগরি, প্রশাসনিক ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করা এবং শিল্পপণ্যের বাজার সম্প্রসারণে বেসরকারি খাতের সঙ্গে সহযোগিতা করা।