কোম শহর হযরত ফাতেমা মাসুমা (সা.)-এর সমাধিস্থল হিসেবে পরিচিত। তিনি শিয়াদের অষ্টম ইমাম হযরত ইমাম রেজা (আ.)-এর সম্মানিত বোন। হযরত মাসুমা (সা.)-এর পবিত্র মাজারের কারণে কোম শহর প্রাচীনকাল থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থনগরী এবং শিয়া ইসলামের অন্যতম প্রধান জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই পবিত্র মাজারটি কোমের শেখান (বাবলান) কবরস্থানে অবস্থিত। মাশহাদে ইমাম রেজা (আ.)-এর মাজারের পর এটিকে ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়।
কোম শহরে হযরত মাসুমা (সা.)-এর আগমন ও ইন্তেকাল
৮১৩ খ্রিষ্টাব্দে আব্বাসীয় শাসক মামুন তার ভাই আমিনকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসেন। খোরাসানের (মারভ) গুরুত্ব বিবেচনা করে তিনি তার রাজধানী সেখানে স্থানান্তর করেন। মামুনের শাসনের প্রথম কয়েক বছর নানা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়। যেহেতু মামুনের বিরুদ্ধে অধিকাংশ বিরোধিতা আলাভিদের (হযরত আলী ইবনে আবি তালিবের অনুসারী) পক্ষ থেকে আসছিল, তাই তিনি বাহ্যিকভাবে আলাভিদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপনের একটি কৌশল গ্রহণ করেন।
এই উদ্দেশ্যে তিনি মদিনা থেকে হযরত আলী ইবনে মুসা আল-রেজা (আ.)-কে মারভে আমন্ত্রণ জানান এবং তাঁকে নিজের উত্তরাধিকারী বা যুবরাজ করার প্রস্তাব দেন। ইমাম রেজা (আ.) মামুনের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবগত ছিলেন; তবে বাধ্য হয়ে তিনি এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন।
সে সময় কোম শহরে অনেক শিয়া বসবাস করতেন এবং তৎকালীন শাসকদের নানা চাপ সত্ত্বেও তারা নিজেদের বিশ্বাস থেকে সরে আসেননি। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কারণে মামুন চাননি যে ইমাম রেজা (আ.) কোমের মধ্য দিয়ে যাতায়াত করুন। তাই তিনি তাঁকে খোরাসানে যাওয়ার জন্য অন্য একটি পথ বেছে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, ইমাম রেজা (আ.) তাঁর যাত্রাপথে কোম শহরেও উপস্থিত হয়েছিলেন। যদিও এ বিষয়ে শক্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
ইমাম রেজা (আ.) খোরাসানে পৌঁছানোর পর মদিনায় তাঁর পরিবার প্রায় এক বছর তাঁর কোনো সংবাদ পাননি। এ কারণে হযরত মাসুমা (সা.) কয়েকজন সঙ্গীসহ তাঁর ভাই ইমাম রেজা (আ.)-এর খোঁজখবর নেওয়ার জন্য খোরাসানের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
বর্ণিত আছে যে, সাভে শহরে পৌঁছানোর পর হযরত মাসুমা (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি জানতে পারেন যে কোম শহরে অনেক শিয়া বসবাস করেন। তাই তিনি কুমের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে সেখানে পৌঁছান। কুমে মুসা ইবনে খাজরাজ নামের এক ব্যক্তি তাঁকে আতিথ্য প্রদান করেন।
কোম শহরে অবস্থানের ১৭ দিন পর হযরত মাসুমা (সা.) ইন্তেকাল করেন। এই মহান নারীর পবিত্র দেহ কুমের বাবলান কবরস্থানে দাফন করা হয়। তাঁর ইন্তেকাল ৮১৬ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়।
হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারের ইতিহাস
ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, হযরত মাসুমা (সা.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর কবরের ওপর বাঁশ বা খেজুরপাতা দিয়ে একটি ছাউনি তৈরি করা হয়েছিল। কয়েক বছর পর ইমাম জাওয়াদের (ইমাম রেজা (আ.)-এর পুত্র এবং শিয়াদের নবম ইমাম) বংশধরদের একজন, যাঁর নাম ছিল জয়নাব, ৮৭০ খ্রিষ্টাব্দে কোমে আসেন এবং তাঁর সমাধির ওপর একটি গম্বুজ নির্মাণ করেন।
এই গম্বুজটি দ্বাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত টিকে ছিল। ৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিম দিকের প্রবেশপথ সম্প্রসারণ ছাড়া তখন এতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন করা হয়নি।
দ্বাদশ শতাব্দীর পর এই পবিত্র মাজারে বিভিন্ন সংযোজন ও সংস্কার করা হয়। এর মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে সেলজুক শাসনামলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু সংস্কার হয়। এ সময় সেলজুক শাসক তুগরুল প্রথমের শাসনকালের প্রভাবশালী ব্যক্তি আমির আবুল ফজল ইরাকি বিদ্যমান স্থাপনাটি সংস্কার করেন। তিনি এমন ব্যবস্থা করেন, যাতে মাজারটি আরও সুন্দর ও উপযুক্ত রূপ লাভ করে এবং মানুষের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান হিসেবে গড়ে ওঠে।
চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সেলজুক সুলতান সানজার-এর শাসনামলেও সমাধিটি চকচকে ও মূল্যবান টাইলস দিয়ে সজ্জিত করা হয়। এর ফলে মাজারটির সৌন্দর্য ও জাঁকজমক আরও বৃদ্ধি পায়।
সাফাভি যুগে হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজার
সাফাভি যুগে (১৫শ ও ১৬শ শতাব্দী) হযরত মাসুমা (সা.)-এর পবিত্র মাজারের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। সাফাভি বংশের প্রথম শাসক শাহ ইসমাইলের সময় পুরোনো গম্বুজটি ভেঙে তার পরিবর্তে একটি নতুন গম্বুজ নির্মাণ করা হয়। দ্বিতীয় সাফাভি শাসক শাহ তাহমাসবও হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারের জন্য বিভিন্ন ওয়াক্ফ সম্পত্তি দান করেন, যাতে সেগুলো মাজারের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় করা যায়।
পরবর্তী সময়ে সাফাভি রাজপরিবারের অনেক সদস্য এই মাজারে সমাহিত হন। সাফাভি বংশের ষষ্ঠ শাসক শাহ সাফি ১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে মাজারের দক্ষিণ অংশে দাফন হন। এছাড়া শাহ আব্বাস দ্বিতীয়, যিনি ১৬৬৬ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন, এবং শাহ সুলায়মান, যিনি ১৬৯৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন, তাঁরাও হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারে সমাহিত রয়েছেন। শাহ সুলায়মান দ্বিতীয়ও ১৭৪৯ বা ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে এই মাজারে সিংহাসনে আরোহণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন।
আফগানদের ইরান আক্রমণ ও সাফাভি সাম্রাজ্যের পতনের পর কোম ও আক্রমণের শিকার হয় এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তবে কাজার যুগে (১৮শ ও ১৯শ শতাব্দী) কোম আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পায়। আফগানদের আক্রমণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ধীরে ধীরে দূর করা হয়। এ সময় কাজার বংশের কয়েকজন শাসক হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারে নিজেদের জন্য সমাধিও নির্মাণ করেন।
আধুনিক যুগে মাজারের উন্নয়ন
আধুনিক যুগেও হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারে নির্মাণ ও সংস্কারকাজ অব্যাহত রয়েছে এবং এতে নতুন নতুন প্রাঙ্গণ যুক্ত হয়েছে। পাথর ও টাইলস দিয়ে মাজারের বিভিন্ন স্থাপনার পুনর্নির্মাণ, অভ্যন্তরীণ দেয়ালগুলো সবুজ মার্বেল দিয়ে সজ্জিত করা এবং ১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে নতুন জারিহ বা সমাধি-ঘের স্থাপন এসব সাম্প্রতিক পরিবর্তনের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। এ সময় মাজারের অন্যান্য অংশ, বিশেষ করে মিনারগুলোও সংস্কার করা হয়।
মাজারের স্থাপত্য
মাজার ও সোনার গম্বুজ, যা পুরো স্থাপত্যের কেন্দ্রীয় অংশ গঠন করেছে, এর সবচেয়ে প্রাচীন অংশ। ১৬শ শতাব্দীতে, শাহ ইসমাইল সাফাভির সময়, সোনালি ইওয়ান নির্মিত হয়। আর আয়না ইওয়ান, পূর্ব রওজা বা বারান্দা এবং মসজিদে বালাসার ১৯শ শতাব্দীতে নির্মিত হয়।
পবিত্র মাজারের বিভিন্ন স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ের ফলে এখানে ইসলামী স্থাপত্যের এক মূল্যবান ও বৈচিত্র্যময় সংগ্রহ গড়ে উঠেছে। তবে এই মাজারকে অনন্য করে তোলে এবং এখানে উপস্থিতির অভিজ্ঞতাকে স্মরণীয় করে রাখে এর অতুলনীয় আধ্যাত্মিকতা যে আধ্যাত্মিকতা হযরত মাসুমা (সা.)-এর পবিত্র উপস্থিতির কারণে এই মাজার ও কোম শহরে অনুভব করা যায়।
হযরত মাসুমা (সা.)-এর মাজারের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন
এই মহিমান্বিত মাজারটি ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে ১২৮ নম্বর হিসেবে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।