এজেন্সি
মাহান শাহজাদা বাগান: শুষ্ক অঞ্চলের বুকে ইরানি বাগান নির্মাণের বিস্ময়

মাহান শাহজাদা বাগান: শুষ্ক অঞ্চলের বুকে ইরানি বাগান নির্মাণের বিস্ময়

মাহান শাহজাদা বাগান: শুষ্ক অঞ্চলের বুকে ইরানি বাগান নির্মাণের বিস্ময়

ইরানি বাগান ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধিত হয়েছে। ইরানি বাগানের অন্যতম অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো প্রধানত শুষ্ক ও পানিশূন্য ভূমির মাঝেও সবুজ ও প্রাণবন্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা। এ কারণে এসব বাগানে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বৈশিষ্ট্যই ছিল না, বরং পানি সঞ্চালন ও বণ্টনের জন্য একটি সুপরিকল্পিত ও কার্যকর ব্যবস্থাপনাও গড়ে তোলা হয়েছিল। এই বৈশিষ্ট্যগুলো মাহান শাহজাদা বাগান বা শাহজাদা মাহান বাগান-এ স্পষ্টভাবে দেখা যায়। এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকাভুক্ত ইরানি বাগানগুলোর অন্যতম।

শাহজাদা বাগানের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

এই সুন্দর বাগানটি নির্মাণের সূচনাকাল কাজার যুগের শেষভাগের (ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিক) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। সে সময় কেরমানের শাসক মুহাম্মদ হাসান খান এই বাগান নির্মাণের নির্দেশ দেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল উষ্ণ, শুষ্ক ও মরুপ্রধান কেরমান অঞ্চলের মধ্যে একটি মনোরম ও আরামদায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করা। কিন্তু তিনি এত দীর্ঘজীবী হননি যে নিজের প্রচেষ্টার ফলাফল দেখে যেতে পারেন। তাঁর মৃত্যুর পর কাজার সম্রাট নাসের আল-দীন শাহের (শাসনকাল ১৮৩১ থেকে ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ) নাতি আব্দুল হামিদ মির্জা নাসেরউদ্দৌলা কেরমানের শাসক হন এবং বাগান নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যান। তিনি ১১ বছর ধরে এই বাগান নির্মাণে ব্যয় করেন, কিন্তু মুহাম্মদ হাসান খানের মতো তিনিও তাঁর প্রচেষ্টার পূর্ণতা দেখে যেতে পারেননি। তাঁর মৃত্যুর পর বাগান নির্মাণের কাজ পরিত্যক্ত হয়ে যায়। তবে মানুষ এই কাজার রাজপুত্র আব্দুল হামিদের স্মৃতিতে বাগানটির নাম দেয় শাহজাদা (রাজপুত্রের বাগান)। আজও বাগানের দেয়ালে অসমাপ্ত নকশা ও অলংকরণের চিহ্ন দেখা যায়। এই স্থাপনার নির্মাণকাজ সমাপ্তির বছর হিসেবে ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দ (১২৭৬ হিজরি শামসি) উল্লেখ করা হয়।




মাহানের শাহজাদা উদ্যান

শাহজাদা বাগানের আয়তন প্রায় পাঁচ হেক্টর। এর দৈর্ঘ্য ৪০৭ মিটার এবং প্রস্থ ১২২ মিটার। বাগানটি পূর্ব ও পশ্চিম এই দুটি অংশ নিয়ে গঠিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে বাগানটির উচ্চতা প্রায় ২০২০ মিটার। অন্য অনেক ইরানি বাগানের মতো শাহজাদা বাগানেও আয়তাকার আকৃতির প্রাঙ্গণ ও জলাধার (হাউজ) দেখা যায়। বাগানের ভূমির গঠন সামান্য ঢালু, যা এর জলনালাগুলোতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করে। বাগানের মধ্য দিয়ে পানির প্রবাহ শুধু গাছপালায় সেচ প্রদান এবং পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করত না, বরং স্থানটিকে শীতল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বাগানে একটি প্রবেশদ্বার বা সর্দার রয়েছে, যেখানে অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য একটি স্থানও রাখা হয়েছে। বাগানের প্রবেশদ্বার থেকে ২৩৫ মিটার দূরে ৪৮৭ বর্গমিটার আয়তনের একটি ভবন অবস্থিত। অতীতে এই ভবনটি বাগানের বাসিন্দা ও অতিথিদের আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এটি একটি ঐতিহ্যবাহী রেস্তোরাঁয় রূপান্তরিত হয়েছে।



শাহজাদা মাহান বাগানটি একটি মরুভূমি অঞ্চলে নির্মিত হয়েছে।

পুরো বাগানজুড়ে পাইন, সাইপ্রাস ও চেনার গাছ দেখা যায়। এছাড়াও বাগানে বিভিন্ন ধরনের ফলদ গাছ রোপণ করা হয়েছে। ফলদ গাছগুলোর অবস্থান বাগানের মূল ভবনের পেছনের অংশে। এর ফলে বাগানের এই অংশটি একটি পৃথক ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে এবং এটি সাধারণ মানুষের প্রবেশ থেকে কিছুটা দূরে রাখা হয়েছে। এই অংশে একটি গোসলখানাও নির্মাণ করা হয়েছে। গোসলখানার পাশে প্রহরীদের থাকার জন্য একটি ভবনও রয়েছে। বাগানের অধিকাংশ স্থাপনা ইট দিয়ে নির্মিত। ইটের ওপর কাদামাটি ও খড়ের মিশ্রণে তৈরি প্রলেপ (কাহগিল) দেওয়া হয়েছে। বাগানের বিভিন্ন অংশে, বিশেষ করে প্রবেশদ্বারে, টাইলসের অলংকরণ দেখা যায়।

নিশ্চয়ই এমন একটি বিশাল বাগানে সেচ দেওয়া, যেখানে পানি সবচেয়ে দুর্লভ ও মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়, সহজ কাজ ছিল না। এই বড় বাগানে পানি সরবরাহের জন্য তিগরান কানাত ব্যবহার করা হতো। এই কানাত দক্ষিণ কেরমানের জোবার পর্বতের উচ্চভূমি থেকে পানি এনে বাগানে পৌঁছে দিত। এই কানাতের পানি অত্যন্ত স্বচ্ছ এবং এমনকি গ্রীষ্মকালেও এতে মনোরম শীতলতা বজায় থাকে। বাগানের প্রকৌশলীরা এমনভাবে এর নকশা তৈরি করেছিলেন যে, বাগানে প্রবেশের পর পানি ধাপাকৃতি পথে প্রবাহিত হয়ে পরস্পর সংযুক্ত ও স্তরবিশিষ্ট কয়েকটি জলপ্রপাত সৃষ্টি করত এবং শেষে বাগানের বাইরে বেরিয়ে যেত।

 

মাহান শাহজাদা বাগান কোথায় অবস্থিত?

এই বাগানটি মরুপ্রধান অঞ্চলে অবস্থিত। এটি মাহান শহর থেকে ৬ কিলোমিটার এবং কেরমান শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই শাহজাদা বাগানকে মরুর বুকে স্বর্গ নামেও অভিহিত করা হয়।

মাহান শাহজাদা বাগানের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন

শাহজাদা বাগান ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে (১৩৫৩ হিজরি শামসি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় নিবন্ধিত হয়। এই বাগানের বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি লাভের ঘটনা ২০১১ খ্রিস্টাব্দের। ওই বছর ইউনেস্কো এই বাগানটিকে আরও আটটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার সঙ্গে ইরানি বাগান হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

 
মাহান শাহজাদা বাগান: শুষ্ক অঞ্চলের বুকে ইরানি বাগান নির্মাণের বিস্ময়
কেরমান
কেরমান
,Natural

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: