এজেন্সি
মোন কানাত প্রাচীন ইরানি প্রকৌশল দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন।

মোন কানাত প্রাচীন ইরানি প্রকৌশল দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন।

মোন কানাত প্রাচীন ইরানি প্রকৌশল দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন।

কানাত নির্মাণের প্রকৌশল এতটাই জটিল ও নিখুঁত যে হিসাব-নিকাশ ও পরিমাপের সামান্যতম ভুলও কানাতের কাঠামো বেঁকে যাওয়া, তলদেশ ধুয়ে ক্ষয় হওয়া এবং দেয়াল ধসে পড়ার কারণ হতে পারে। তাই কানাতকে প্রাচীন যুগের সবচেয়ে জটিল ও বিস্ময়কর ভূগর্ভস্থ স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। এর নির্মাণজ্ঞান এমন এক অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বিকশিত হয়েছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সঞ্চিত ও উন্নত হয়েছে। ইরানিরা কানাত খননের প্রযুক্তিতে এমন দক্ষতা অর্জন করেছিল যে তারা বহু কিলোমিটার দূর থেকে পানি স্থানান্তরের মতো সাহসী পরিকল্পনাও বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়েছিল। মোন  কানাতে যা দেখা যায়, তা এই ধরনেরই একটি সাহসী ও উদ্ভাবনী পরিকল্পনার উদাহরণ একটি দুই-স্তরবিশিষ্ট কানাত, যার কোনো তুলনা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই।

মোন কানাত কোথায় অবস্থিত?

মোন কানাত ইসফাহান প্রদেশের অন্তর্গত আরদেস্তান শহরে অবস্থিত। আরদেস্তান ইসফাহান শহরের উত্তরে ১২০ কিলোমিটার এবং তেহরানের দক্ষিণে ৪১৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তেহরান-বন্দর আব্বাস মহাসড়ক (ট্রানজিট সড়ক) এই শহরের কাছ দিয়ে অতিক্রম করেছে।

আরদেস্তান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত। আরদেস্তানের দক্ষিণ অংশে কারকাস পর্বতমালার শেষাংশ অবস্থান করায়, এখানে দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে একটি মৃদু ঢাল লক্ষ্য করা যায়।

ইতিহাসজুড়ে আরদেস্তানের মানুষের জন্য পানি সরবরাহ একটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। এই কারণে ভূমির ঢালের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বেশ কয়েকটি কানাত (ভূগর্ভস্থ জলসেচ ব্যবস্থা) খনন করা হয়, যাতে পানি শহরাঞ্চলে পৌঁছে দেওয়া যায়।

মোন কানাতের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোন কানাত নির্মাণের ইতিহাস প্রায় ৮০০ বছর পুরোনো। যে মাটির স্তরের মধ্যে কানাত নির্মাণ করা হবে, সেই মাটির প্রকৃতি সম্পর্কে জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কানাত নির্মাণকারী প্রকৌশলীরা মাটির ধরন অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের নকশা ও কৌশল ব্যবহার করতেন। এই পদ্ধতিগুলোর কারণেই শত শত বছর পরও কানাতগুলো কার্যকর অবস্থায় টিকে আছে।

মোন কানাত কাদামাটির স্তরের মধ্যে খনন করা হয়েছে। কাদামাটির কণাগুলো অত্যন্ত আঠালো এবং এতে পানির প্রবেশক্ষমতা খুব কম। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই মোন কানাতকে দুই স্তরে নির্মাণ করা হয়েছে, যাতে ওপরের স্তরের পানি নিচের স্তরে প্রবেশ করতে না পারে। মজার বিষয় হলো, কানাতের দুই স্তরে প্রবাহিত পানির বৈশিষ্ট্য একে অপরের থেকে আলাদা। ওপরের স্তরের পানি তুলনামূলকভাবে মিষ্টি, হালকা ও ঠান্ডা, তাই এটি পানীয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে, নিচের স্তরের পানি, যা প্রায় চার মিটার নিচে অবস্থিত, তার তাপমাত্রা বেশি এবং পানির কঠোরতাও বেশি।

এছাড়াও কানাতের এই দুই স্তরের পানির প্রবাহের পরিমাণেও (দৈনিক জলপ্রবাহ বা ডেবিট) পার্থক্য রয়েছে। নিচের স্তরের পানির প্রবাহ তুলনামূলকভাবে বেশি। কানাতের পথে একটি অংশ কাপড় ধোয়ার স্থান  হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছে। এই স্থানটি কাপড় ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয় এবং এখনো চালু রয়েছে। এই কানাতটির দৈর্ঘ্য ৩৫০০ মিটারেরও বেশি এবং এর মাদারচাহ (মূল কূপ, যা পানির উৎসের সঙ্গে সংযুক্ত)-এর গভীরতা ৩১ মিটার

কানাতের মাদারচাহকে সাধারণত জোড়া কূপ বলা হয়, কারণ এটি পাশাপাশি অবস্থিত দুটি কূপ নিয়ে গঠিত। এর একটি নিচের স্তরের কানাতের পানি সরবরাহ করে এবং অন্যটি ওপরের স্তরের কানাতের পানি সরবরাহ করে।

কানাতের পুরো পথে ৩০টি উল্লম্ব কূপ খনন করা হয়েছে, যেগুলো কানাতের সহায়ক কূপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। দুটি কানাতের মাজহার (যেখান দিয়ে পানি বাইরে বের হয়) একে অপর থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে অবস্থিত। কানাতকে দুই স্তরে নির্মাণ করার কারণ নিয়ে বিভিন্ন মতামত রয়েছে। তবে মনে করা হয়, এর প্রধান কারণ ছিল ভূগর্ভস্থ দুটি পৃথক জলাধার (জলস্তর)-এর অস্তিত্ব। প্রায় ৮০০ বছর আগে স্থানীয় বিশেষজ্ঞরা ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন যে এই দুটি জলস্তরের পানি একে অপরের থেকে ভিন্ন এবং এগুলো ভিন্ন ভিন্ন কাজে ব্যবহার করা সম্ভব।

কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, ওপরের স্তরের কানাতটি তুলনামূলকভাবে পুরোনো। এর কোনো একটি কূপ পরিষ্কার করার (পলি অপসারণের) সময় শ্রমিকরা এই কানাতের নিচে আরেকটি ভূগর্ভস্থ জলস্তরের সন্ধান পান এবং এরপর নিচের স্তরের কানাত খননের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। যেহেতু দুটি কানাতের কূপগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত, তাই কোনো একটি পানিপথ বন্ধ হয়ে গেলে পানি অন্য কানাতের দিকে প্রবাহিত হয় এবং শেষ পর্যন্ত নির্গমনস্থলে পৌঁছে যায়।

মোন কানাতের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন

মোন কানাতের জাতীয় নিবন্ধন করা হয় ২০০৩ খ্রিস্টাব্দে ।এই কানাতটি ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহরে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির অধিবেশনে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

 

মোন কানাত প্রাচীন ইরানি প্রকৌশল দক্ষতার এক অসাধারণ নিদর্শন।
ইয়াজদ
আরদাকান
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: