হাসানাবাদ মাশির কানাত: উষ্ণ ও দহনময় অঞ্চলের বুকে স্বচ্ছ পানির এক প্রবাহ
কানাত হলো পানি স্থানান্তরের একটি ইরানি প্রযুক্তি, যা একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ বা জলপথ এবং একাধিক কূপের সমন্বয়ে গঠিত। এক হাজার বছরেরও বেশি সময় আগে ইরানি স্থপতি ও প্রকৌশলীরা সীমিত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করেও অসাধারণ উদ্ভাবনী দক্ষতা দেখিয়েছিলেন। তারা বহু কিলোমিটার দূরের উৎস থেকে পানি এনে অন্য অঞ্চলে পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং ইরানের শহর ও গ্রামগুলোর জীবনীশক্তি সচল রেখেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইরানজুড়ে এমন অনেক কানাত রয়েছে, যেগুলো শত শত বছর পরও টিকে আছে এবং এখনো সেগুলোতে পানির প্রবাহ অব্যাহত রয়েছে। এর একটি উদাহরণ হলো “হাসানাবাদ মাশির কানাত”।
হাসানাবাদ কানাত কোথায় অবস্থিত?
ইরানের কানাতগুলো প্রধানত উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলে গড়ে উঠেছে। ইরানের সব প্রদেশের মধ্যে ইয়াজদ প্রদেশ তার বিপুল সংখ্যক এবং বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কানাতের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। হাসানাবাদ মাশির কানাত এই প্রদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ কানাত, যা মেহরিজ শহরে অবস্থিত। মেহরিজ শহর ইয়াজদ শহরের দক্ষিণে অবস্থিত এবং এর জনসংখ্যা ৩০ হাজারের বেশি। মেহরিজের প্রকৃতি যেহেতু উষ্ণ ও শুষ্ক, তাই এখানকার ঘরবাড়িগুলো এমনভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যাতে সূর্যের আলো সরাসরি কম প্রবেশ করে। বাতাস চলাচলের জন্য বাদগির (বায়ু ধরার স্থাপনা), পুরু ও উঁচু দেয়াল, গম্বুজাকৃতি ছাদ এবং সর্দাব (ভূগর্ভস্থ কক্ষ) এসব মেহরিজের ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য।
কিছু বিশেষজ্ঞ মেহরিজ শহরের প্রাচীনত্বকে সাসানীয় রাজা আনুশিরভানের শাসনকাল (৫৩১ থেকে ৫৭৯ খ্রিস্টাব্দ)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করেন। তাদের মতে, এই শহরের নাম সাসানীয় রাজকন্যা “মেহরনেগার”-এর নাম থেকে এসেছে। মেহরিজজুড়ে অসংখ্য ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে, যা এই অঞ্চলের প্রাচীন ও সমৃদ্ধ ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। এখানে ইরানের মরু অঞ্চলের স্থাপত্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়। এসব ঐতিহ্যের মধ্যে কয়েকটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায়ও স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে হাসানাবাদ কানাত, পাহলাভানপুর বাগান, মির্জা নসরুল্লাহ জলচালিত কল এবং জেইনালদিন কারাভানসারাই।
হাসানাবাদ কানাত: বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস
হাসানাবাদ কানাতকে বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘ কানাত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শত শত বছর ধরে এটি ৭১ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে পানি পরিবহন করে আসছে। এই কানাত নির্মাণের সময়কাল ইসলামী মধ্যযুগের (অষ্টম হিজরি শতাব্দী / চতুর্দশ খ্রিস্টাব্দ) সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করা হয়। কানাতটি গরবালবিজ পর্বত থেকে শুরু হয়েছে, যা শিরকুহ পর্বতমালার একটি অংশ। এর মাতারচাহ বা মূল কূপের (কানাতের শুরুতে খনন করা প্রধান কূপ, যা ভূগর্ভস্থ পানির স্তরের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকে) গভীরতা ৪০ মিটার। গরবালবিজ ঝরনা হাসানাবাদ মাশির কানাতের মাতারচাহের কাছে অবস্থিত। এই ঝরনাটি মাদভার নামের একটি গ্রামের কাছে অবস্থিত এবং এর পানি প্রায় ৪০ মিটার দীর্ঘ ভূগর্ভস্থ পথ তৈরি করা ফাঁপা স্থানগুলোর মধ্য দিয়ে বের হয়ে আসে। এভাবে এই ঝরনার পানি সংগ্রহ এলাকার আনুমানিক আয়তন প্রায় ১০ বর্গকিলোমিটারে পৌঁছায়। এই ঝরনার অতিরিক্ত প্রবাহ কানাতের পানির একটি অংশের উৎস হিসেবে কাজ করে। কানাতটি শেষ পর্যন্ত মেহরিজ শহর এবং এই শহরের দেহনু ও হাসানাবাদ গ্রাম অতিক্রম করে ইয়াজদ শহরের মারিয়ামাবাদ এলাকায় পৌঁছায়। যেহেতু কানাতটির পানির বহির্গমন স্থান বা মাজহার “হাসানাবাদ মাশির” এলাকায় অবস্থিত, তাই এটিকে এই নামে পরিচিত করা হয়েছে। হাসানাবাদ কানাতের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এটি পাহলাভানপুর বাগানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে, যা এই কানাতের অন্যতম আকর্ষণীয় দিক।

হাসানাবাদ কানাত পাহলাভানপুর বাগানের মাঝ দিয়ে চলে গেছে। এটি ইরানের একটি বিশ্ব ঐতিহ্য।
বার্ষিক বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে হাসানাবাদ কানাতের পানির প্রবাহের পরিমাণ পরিবর্তিত হয়। তবে সাধারণত এই কানাতের পানির প্রবাহ প্রতি সেকেন্ডে ১১০ থেকে ২০০ লিটারের মধ্যে থাকে। কানাতের পুরো পথজুড়ে চুনাপাথর ও লবণের স্তর না থাকায়, এর উৎসস্থলের পানির গুণমান এবং শেষ প্রান্তের পানির গুণমানে তেমন কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। কানাতের শুরুর দিকে, গরবালবিজ ও মাদভার এলাকার মাঝামাঝি স্থানে, কয়েকটি সিঁড়িসহ মানুষের হাতে তৈরি একটি ভূগর্ভস্থ পথ রয়েছে, যা পানির প্রবাহের ভূগর্ভস্থ পথের সঙ্গে সংযুক্ত। এই পথ দিয়ে কানাতের পানিতে পৌঁছানো যায় এবং তা পান করার জন্য ব্যবহার করা হয়। মেহরিজ থেকে ইয়াজদ পর্যন্ত পানিবাহী এই ভূগর্ভস্থ নালার গভীরতা খুব বেশি নয়। দীর্ঘ একটি অংশে কানাতের পানি মাটির উপরিভাগ দিয়েই প্রবাহিত হয়।
হাসানাবাদ কানাতের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন
হাসানাবাদ মাশির কানাত ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে (১৩৯৫ হিজরি শামসি) তুরস্কের ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য কমিটির ৪০তম অধিবেশনে আরও ১০টি কানাতের সঙ্গে ইরানের ২০তম বিশ্ব ঐতিহ্য নিদর্শন হিসেবে নিবন্ধিত হয়। এই কানাতের জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন সম্পন্ন হয় ২০১১ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮৯ হিজরি শামসি)।
| হাসানাবাদ মাশির কানাত: উষ্ণ ও দহনময় অঞ্চলের বুকে স্বচ্ছ পানির এক প্রবাহ | |
| ইয়াজদ | |
| মেহরিজ | |
| Registration | Unesco, |

