পর্যটন আকর্ষণ স্থান

বাফ্‌ক, উষ্ণহৃদয় ও অতিথিপরায়ণ মানুষের ভূমি।

বাফ্‌কের প্রাচীন ইতিহাস, ফলনশীল ও ঘন খেজুরবাগান এবং উষ্ণহৃদয় ও অতিথিপরায়ণ মানুষের জন্য এটি মনোরম ভ্রমণের একটি আদর্শ স্থান।

ইয়াজদ প্রদেশে ঐতিহাসিক ইয়াজদ শহর তার ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বিশেষ স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত। তবে এই প্রদেশের অন্যান্য শহরও এই সুন্দর শহরের তুলনায় কোনো অংশে কম নয়! বাফ্‌ক ইয়াজদ প্রদেশের একটি প্রশাসনিক এলাকা, যাকে বিভিন্ন দিক থেকে অনন্য ও অতুলনীয় বলা যায়। এই এলাকা যেমন মরুভূমিতে প্রবেশের একটি প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হয়, তেমনি সুন্দর খেজুরবাগান, সমৃদ্ধ ইতিহাস এবং বিশাল খনির জন্যও বিখ্যাত। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে এই অঞ্চলকে খেজুর, লোহা ও সূর্যের দেশ নামে অভিহিত করা হয়েছে। অবশ্যই বাফ্‌কের উষ্ণহৃদয় ও অতিথিপরায়ণ মানুষের কথাও উল্লেখ করতে হয়। তাঁদের সঙ্গে অল্প সময়ের পরিচয় ও মেলামেশাও এই অঞ্চলে ভ্রমণের আনন্দ অনেক বাড়িয়ে দেয়।

বাফ্‌কের ভৌগোলিক অবস্থান ও ইতিহাস

বাফ্‌ক শহর বাফ্‌ক প্রশাসনিক জেলার কেন্দ্র এবং ইয়াজদ শহর থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বাফ্‌কের বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থান এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্রে পরিণত করেছে। ইরানের দক্ষিণ থেকে উত্তর এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমমুখী রেলপথ এই শহরের মধ্য দিয়ে গেছে। বাফ্‌কে অনেক খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাফ্‌কে ৫ বিলিয়ন টনেরও বেশি লৌহ আকরিক এবং ৩০ মিলিয়ন টন সীসা ও দস্তা রয়েছে।

বাফ্‌কের জলবায়ু শুষ্ক ও মরুভূমিপ্রধান এবং এখানকার জনসংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই জেলার গড় উচ্চতা ৯৯৫ মিটার। খেজুর, খেজুরপাতার তৈরি হস্তশিল্প এবং পেস্তা এখানকার প্রধান স্মারক ও উপহারসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে। প্রায় ২ হাজার হেক্টরজুড়ে বিস্তৃত সমৃদ্ধ খেজুরবাগানের কারণে বাফ্‌ক ইরানের অন্যতম প্রধান খেজুরপাতার হস্তশিল্প বা মাদুর তৈরির কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০২২ সালে এই শহরকে ইরানের জাতীয় মাদুরশিল্পের শহর হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

 

বাফ্‌কের দর্শনীয় স্থান ও পর্যটন আকর্ষণ

বাফ্‌কে অনেক ঐতিহাসিক নিদর্শন ও দর্শনীয় স্থান রয়েছে, যা এই অঞ্চল ভ্রমণকে অত্যন্ত আনন্দদায়ক করে তোলে। বাফ্‌কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও পরিচিত দর্শনীয় স্থানগুলো হলো:

খান চত্বর

এই চত্বরটি জন্দীয় ও কাজার যুগের, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর। বর্তমানে খান চত্বর বাফ্‌ক শহরের মাঝখানে অবস্থিত। চত্বরের মাঝখানে বেশ কয়েকটি খেজুরগাছ রয়েছে, যা বাফ্‌ক শহরের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয় এবং চত্বরটির সৌন্দর্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চত্বরের কাছাকাছি কারাভানসরাই, পানির সংরক্ষণাগার এবং জামে মসজিদের মতো মূল্যবান স্থাপনাও রয়েছে।

ইমামজাদা আবদুল্লাহ

আবদুল্লাহ ইবনে মুসা ইবনে জাফর ছিলেন ইমাম রেজার ভাই এবং শিয়াদের অষ্টম ইমামের ভাই। এই সম্মানিত ইমামজাদার সমাধি বহু প্রাচীনকাল থেকেই শহরের মানুষের কাছে শ্রদ্ধার স্থান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বাহ্যিক দিক থেকে এই পবিত্র মাজারের টাইলসের কারুকাজ অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এই সমাধির মূল স্থাপনাটি পঞ্চম হিজরি শতাব্দী, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় একাদশ শতাব্দীর বলে মনে করা হয়।

দারানজির মরুভূমি

দারানজির বা দারেহ-আনজির মরুভূমি বাফ্‌কের একটি প্রাকৃতিক আকর্ষণ। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ২০ কিলোমিটার। এর মোট আয়তন প্রায় ৭৫০ বর্গকিলোমিটার। এই এলাকার প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে কাদামাটির ভূমি এবং বাকি ৪০ শতাংশ, যা মূলত দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত, লবণাক্ত ভূমি বা লবণক্ষেত্র দিয়ে আবৃত। দক্ষিণ অংশে লবণাক্ত পরিবেশে জন্মানো কিছু উদ্ভিদও দেখা যায়। দারানজির মরুভূমির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রাকৃতিক ও অক্ষত পরিবেশ।

মাগেস্তান মরুভূমি

দারানজিরের ৪০ কিলোমিটার উত্তরে আরেকটি মরুভূমি রয়েছে, যাকে মাগেস্তান বা রিগ-এ জারিন বলা হয়। মাগেস্তান বাইয়াজে গ্রামের দক্ষিণে এবং সাগান্দ গ্রামের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত। এর উত্তরে হাজি-আবাদ জারিন পর্বতমালা রয়েছে। মরুভূমিটির দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে বেশ কয়েকটি লবণগম্বুজ দেখা যায়। মাঝামাঝি অংশ দিয়ে প্রায় বিস্তৃত একটি পর্বতশ্রেণি মরুভূমিটিকে উত্তর ও দক্ষিণ এই দুই ভাগে বিভক্ত করেছে।

বাঘেরআবাদ দুর্গ

এই ঐতিহাসিক দুর্গটি কাজার যুগের, অর্থাৎ খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দীর। বলা হয়, সংকটের সময় স্থানীয় মানুষদের আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশ্যে এই দুর্গ নির্মাণ করা হয়েছিল। এখানে গম ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রীও মজুত রাখা হতো।

বিদ্যমান নথিপত্র থেকে জানা যায়, দুর্গটি তিন ধাপে নির্মিত হয়েছিল। প্রথমে উত্তর দিকের দুই তলা বিশিষ্ট ৮ মিটার উঁচু একটি টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। এর ১০ বছর পর এর সঙ্গে দক্ষিণ দিকের টাওয়ারটি যুক্ত করা হয়। কিছু সময় পর আঞ্চলিক অস্থিরতা বেড়ে গেলে দুর্গের চারপাশে একটি প্রাচীর নির্মাণ করা হয়, যাতে এর নিরাপত্তা আরও বাড়ানো যায়।

পুরো দুর্গে মোট ৪৫টি কক্ষ, দুটি প্রহরী টাওয়ার এবং বেশ কয়েকটি করিডোর রয়েছে। উত্তর টাওয়ারে পাথর নিক্ষেপের জন্য তিনটি স্থান এবং তীরন্দাজদের জন্য ১০টি স্থান দেখা যায়। দক্ষিণ টাওয়ারটি অষ্টভুজাকৃতির এবং এর উচ্চতা প্রায় ১১ মিটার। এই টাওয়ারটিও দুই তলা বিশিষ্ট। এখানে তীরন্দাজদের জন্য ১৬টি স্থান এবং পাথর নিক্ষেপের জন্য চারটি স্থান রয়েছে।


ছবি: বাঘেরআবাদ দুর্গ।

বাফ্‌কের জামে মসজিদ

এই মসজিদটি কাজার যুগের এবং এর দুটি অংশ রয়েছে, গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন। গ্রীষ্মকালীন অংশে বড় বড় বাদগির বা বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রক মিনারসহ একটি শাবেস্তান নির্মাণ করা হয়েছে, যার চেহারা ইয়াজদের গ্র্যান্ড জামে মসজিদের সঙ্গে অনেকটাই সাদৃশ্যপূর্ণ।

ওয়াহশি বাফ্‌কির বাড়ি

বাফ্‌ক শহরের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যিক হলেন ওয়াহশি বাফ্‌কি। তিনি ৯৩৯ হিজরি (১৫৩২ খ্রিস্টাব্দ) সালে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তাঁর বাড়িটিকে একটি জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। ছোট ও মনোরম এই বাড়িটি এখন পর্যটকদের স্বাগত জানায়।

কাতরাম গ্রাম

বাফ্‌কের জলবায়ু মরুভূমিপ্রধান হওয়ায় মনে করবেন না যে এখানে সবুজ ও মনোরম অঞ্চল নেই! বরং এখানে এমন বেশ কিছু সবুজ এলাকা রয়েছে। এর মধ্যে কাতরাম গ্রাম অন্যতম, যা বাজগান পর্বতের পশ্চিম ঢালে অবস্থিত। কাতরাম পাথরের তৈরি বাড়ি এবং সবুজে ঘেরা ছাদযুক্ত সরু গলির জন্য বিখ্যাত।

ছবি: বাফ্‌কের খেজুরবাগানগুলো।

বাফ্‌কের খেজুরবাগান

আপনি যদি বাফ্‌ক ভ্রমণ করেন, তাহলে আপনার ভ্রমণসূচিতে এখানকার খেজুরবাগানগুলো পরিদর্শন অবশ্যই রাখুন। সাধারণত এই খেজুরবাগানগুলোর আশপাশের শহর ও গ্রামগুলোতে মাদুর বোনার কাজও বেশ প্রচলিত।