রাজধানী শহরগুলো সাধারণত ব্যস্ত ও জনসমাগমপূর্ণ হয়ে থাকে, আর তেহরানও এর ব্যতিক্রম নয়। ১২ মিলিয়নেরও বেশি জনসংখ্যার এই শহর সূর্যোদয় থেকে দিনশেষ পর্যন্ত নানা কর্মব্যস্ততায় মুখর থাকে। তাই অনেক পর্যটক হয়তো এই ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়ে নিরিবিলি ও শান্ত পরিবেশে কিছুটা সময় কাটাতে চান। তবে তেহরানের জীবনযাত্রা শুধু কোলাহল ও যানজটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই শহরে রয়েছে অসংখ্য বিনোদনমূলক ও দর্শনীয় স্থান। এর মধ্যে অন্যতম হলো দারবান্দ, যা শহরের উত্তরাঞ্চলের একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত। দারবান্দ বিদেশি পর্যটকদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। এখানে একটি স্মরণীয় ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব ধরনের সুযোগ-সুবিধাই রয়েছে!
দারবান্দ: ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
তেহরানের অংশ হিসেবে পরিচিত হওয়ার আগে দারবান্দ ছিল একটি ছোট্ট গ্রাম। বলা হয়, এই এলাকায় প্রথম যারা বসতি স্থাপন করেছিলেন, তারা ছিলেন তেহরানের আশপাশের তালেকান নামের একটি এলাকার বাসিন্দা। প্রায় দুই শতাব্দী আগে তারা এখানে এসে বসতি স্থাপন করেন। ধীরে ধীরে দারবান্দের অত্যন্ত সুবিধাজনক অবস্থান এবং মনোরম আবহাওয়া ধনী ব্যক্তি ও সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। কাজার শাসনামলে (উনিশ শতকে) কাজার রাজপরিবারের কয়েকজন রাজপুত্র দারবান্দকে নিজেদের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে পাহলভি আমলে (বিশ শতকে), এই এলাকায় অতিথিশালা ও ভিলা নির্মাণ করা হয়। সে সময় দারবান্দ ইরান সরকারের বিদেশি অতিথিদের থাকার অন্যতম প্রধান স্থান ছিল।
বর্তমানে ভৌগোলিক অবস্থানের দিক থেকে দারবান্দকে তেহরান শহরের সর্বউত্তরের এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দারবান্দের দক্ষিণ অংশ সাদাবাদ প্রাসাদ-জাদুঘর-এর সংলগ্ন। মোরগ-মহল্লা (মাগ-মহল্লা), কালাগ-পর, কেনার-মহল্লা এবং সারবান্দ হলো দারবান্দের প্রধান মহল্লাগুলো। এই এলাকাটি বেশ খাড়া ঢালু। দারবান্দের দক্ষিণ অংশ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬০০ মিটার এবং উত্তর অংশ প্রায় ১,৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। দারবান্দ মধ্য আলবোর্জ পর্বতমালায় পর্বতারোহীদের ওঠার অন্যতম প্রধান প্রবেশপথ। তোচাল পর্বতে ওঠার সবচেয়ে জনপ্রিয় পথ হলো দারবান্দের পথ। এই পথে পাস-কালেহ গ্রাম, দো-কুলু জলপ্রপাত এবং শিরপালা আশ্রয়কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ বিরতি বা স্টেশন হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে দো-কুলু জলপ্রপাত সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৭০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং দারবান্দের কাছাকাছি অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য। এই জলপ্রপাতের পানি আলবোর্জ পর্বতের উচ্চভূমিতে জমে থাকা বরফ গলে তৈরি হয়। জলপ্রপাতটির কাছেই শিরপালা আশ্রয়কেন্দ্র অবস্থিত। পর্বতারোহণের পথের শুরুতেই একটি চেয়ারলিফট রয়েছে। এটি পর্যটক ও পর্বতারোহীদের প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আরও উঁচু এলাকায় পৌঁছে দেয়। পর্বতারোহীদের কাছে দারবান্দের বিশেষ গুরুত্বের কারণে এই এলাকায় সারবান্দ স্কয়ারে ‘পর্বতারোহী’ নামে একটি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। ১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে এই স্থানে ভাস্কর্যটি স্থাপন করা হয়।
শুরুতে একই আকৃতির একটি প্লাস্টারের মূর্তি এখানে স্থাপন করা হয়েছিল। কিন্তু দারবান্দের আবহাওয়া এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই মূর্তিটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেটির পরিবর্তে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি তিন মিটার উচ্চতার একটি মূর্তি স্থাপন করা হয়। সেই সিমেন্টের মূর্তিটি আজও একই স্থানে রয়েছে। পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতির কারণে দারবান্দকে একটি পর্যটন এলাকা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং এখানকার স্থানীয় কাঠামোও সেই অনুযায়ী গড়ে উঠেছে। অসংখ্য রেস্তোরাঁ ও খাবারের ব্যবস্থা থাকার বিষয়টি এই এলাকার পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবহারের একটি উদাহরণ। এছাড়াও দারবান্দে প্রায় ২৫০ মিটার দীর্ঘ একটি পথ রয়েছে, যেখানে নানা ধরনের দোকান রয়েছে এবং বিভিন্ন রকমের স্থানীয় খাবার পাওয়া যায়। দারবান্দের এই অংশটি তার রঙিন ও বৈচিত্র্যময় পরিবেশের কারণে বিশেষ করে ফটোগ্রাফিপ্রেমীদের জন্য দারুণ একটি ছবি তোলার স্থান হতে পারে! আপনি যদি ছবি তুলতে ভালোবাসেন, তাহলে বছরের প্রতিটি ঋতুতেই দারবান্দের প্রাকৃতিক দৃশ্য আপনার কাছে আকর্ষণীয় মনে হতে পারে। বসন্তে প্রকৃতির সবুজ সৌন্দর্য, গ্রীষ্মে দারবান্দের প্রতিদিনের কোলাহল ও ব্যস্ততা, শরতে গাছের পাতার অপূর্ব বৈচিত্র্যময় রং এবং শীতকালে তুষারপাত যা পুরো এলাকাকে একটানা সাদা চাদরে ঢেকে দেয় সবই উপভোগ করার মতো। তবে বছরের ঠান্ডার দিনগুলোতে কখনো কখনো তুষারপাত এতটাই তীব্র হয় যে এই এলাকায় যাতায়াত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।