তাবরিজ একটি মনোরম আবহাওয়ার শহর এবং এখানে অনেকগুলো বাগান রয়েছে। এর মধ্যে ফাতেহাবাদ বাগান অন্যতম। বর্তমানে এই বাগানটি আল-গাদির সাংস্কৃতিক ক্যাম্প নামে একটি শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে রূপান্তরিত হয়েছে। বাগানটি তাবরিজ শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে, বাসমাঞ্জ সড়কের পাশে এবং ফাতেহাবাদ গ্রামের কাছাকাছি অবস্থিত। জানজান–তাবরিজ মহাসড়ক এই ক্যাম্পের কাছ দিয়ে যাওয়ায় এখানে যাতায়াত করা বেশ সহজ।
ফাতেহাবাদ বাগানের ইতিহাস
কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, এই বাগানের সূচনা এক শতাব্দীরও বেশি আগে। ইরানি ও ইসলামি স্থাপত্যের ইতিহাস নিয়ে গবেষণাকারী ডোনাল্ড উইলবার (১৯০৭–১৯৯৭) তাঁর ইরানি বাগান ও কুশক গ্রন্থে এই বাগানের উল্লেখ করেছেন এবং বাগানটির বর্ণনা দিতে গিয়ে লিখেছেন:
বাগানের মাঝখানটি ফলের গাছে আচ্ছাদিত। পানির নালার দীর্ঘ ধারা ইরানের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী পুরো বাগানকে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে এবং বাগানে এক ধরনের সামঞ্জস্য সৃষ্টি করেছে। শুধু পুরোনো কুশকের স্থানে নির্মিত নতুন ভবনটি বাগানের এই সামঞ্জস্য কিছুটা নষ্ট করেছে। আমরা যদি উঁচু অংশ, অর্থাৎ বাগানের দক্ষিণ দিক দিয়ে প্রবেশ করি, তাহলে উঁচু-নিচু একটি পথ দেখতে পাই। এই পথের পাশে রয়েছে কয়েকটি পুকুর, যেগুলোর আকৃতি একে অপরের থেকে ভিন্ন। কোনো কোনো অংশে পানির নালার পাশে সবুজ বেষ্টনী দেখা যায়, যেগুলো আবার ফুলের বেষ্টনী দিয়ে সজ্জিত। শেষ পর্যন্ত আমরা বাগানের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থানে, অর্থাৎ গভীর পুকুরটির কাছে পৌঁছাই। পুকুরটির চারপাশ পাথর দিয়ে বাঁধানো। এটি অত্যন্ত গভীর এবং চারদিকে প্রাচীন ও সুউচ্চ গাছ রয়েছে। পুকুরটির উত্তর দিক ভূমির তুলনায় কিছুটা উঁচু। এই বাগানের কোনো একটি অংশ এককভাবে অসাধারণ বা চোখধাঁধানো সুন্দর নয়; কিন্তু সামগ্রিকভাবে বাগানটি আকর্ষণীয় ও শান্তিময়।
ইরানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একজন গুপ্তচর হিসেবেও পরিচিত উইলবার বাগানটির একটি মানচিত্রও তৈরি করেছিলেন। সেই মানচিত্র থেকে জানা যায়, অতীতে এখানে আস্তাবল ও শৌচাগার হিসেবে ব্যবহৃত কিছু স্থাপনা ছিল, যেগুলোর বর্তমানে আর কোনো চিহ্ন দেখা যায় না।
এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিরা এই বাগানটি নির্মাণের কৃতিত্ব সায়েদালমালেক নামের এক ব্যক্তিকে দেন। তিনি তাবরিজের একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন। প্রায় ১৯শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে, তাবরিজের বিত্তশালী ও প্রভাবশালী পরিবারগুলোর অন্যতম আদল পরিবার এই বাগানটি কিনে নেয়। এই ক্রয়ের অংশ হিসেবে আদল পরিবার কানাত, পুকুর, বাগানে অবস্থিত ভবন এবং ফাতেহাবাদ গ্রামের কিছু জমিও অধিগ্রহণ করে। পরবর্তীতে আদল পরিবারের মালিকানাধীন থাকার সময় বাগানটির পরিসর আরও বাড়ানো হয় এবং এর ভেতরের ভবনটিও সংস্কার করা হয়। সংস্কারের সময় ভবনটির সঙ্গে আরও একটি তলা যুক্ত করা হয় এবং এর চারপাশে কিছু নতুন স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। এই ভবনটির মোট নির্মিত আয়তন প্রায় ২০০ বর্গমিটার। কথিত আছে, অতীতে ফাতেহাবাদ বাগান এই অঞ্চলে কলম করা এলম গাছের চারা উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
ফাতেহাবাদ বাগানের ব্যবহার পরিবর্তন
১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দে ফাতেহাবাদ বাগানটি ক্রয় করা হয় এবং পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের শিক্ষা বিভাগের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। এরপর বাগানটির নাম পরিবর্তন করে আল-গাদির সাংস্কৃতিক ক্যাম্প রাখা হয় এবং শিক্ষামূলক ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেখানে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়। এ সময় আরও যেসব কাজ করা হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন চারা রোপণ ও পুরোনো গাছের পুনরুদ্ধার, বাগানের চারপাশে দেয়াল নির্মাণ এবং পানির প্রবাহপথ, পুকুর ও জলাধারগুলোর চারপাশে পাথর বা মঞ্চসদৃশ কাঠামো তৈরি। এসব নতুন অংশ সংযোজন ও বাগানের কাঠামোতে পরিবর্তন এমনভাবে করা হয়েছিল, যাতে এর সামগ্রিক আকৃতিতে কোনো পরিবর্তন না আসে।
ফাতেহাবাদ বাগানের কাঠামো ও দর্শনীয় স্থান
ফাতেহাবাদ বাগানটি প্রায় সমতল ও অল্প ঢালু একটি ভূমিতে উত্তর-দক্ষিণমুখীভাবে অবস্থিত। এই দিকটি বাগানের পুরোনো কানাতের পানির প্রবাহের দিকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই অক্ষ বরাবর আটটি মঞ্চ বা সোপানসহ একটি হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে মোট ১৮টি ধাপ রয়েছে। এই হাঁটার পথের সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ অংশের উচ্চতার পার্থক্য ৩০৫ সেন্টিমিটার।
তাবরিজের ফাতেহাবাদ বাগানের জাতীয় নিবন্ধন
বর্তমানে প্রায় ৩০ হেক্টর আয়তনের ফাতেহাবাদ বাগান ও প্রাসাদটি ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।