দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকাকে ইরানের অন্যতম আদিম ও অক্ষত প্রাকৃতিক অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের সমৃদ্ধির দিক থেকে এই এলাকার তুলনা খুব কমই পাওয়া যায়। দেনা অঞ্চলের শীতল ও পার্বত্য প্রকৃতির কারণে শরৎ ও শীতকালের বেশিরভাগ সময়ই এই অঞ্চল তুষারে ঢাকা থাকে।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকা: গঠন ও বৈশিষ্ট্য
২৫,৮৩৯ হেক্টর আয়তনের এই অঞ্চলটি সম্পূর্ণ পার্বত্য এলাকায় অবস্থিত। জাগরোস পর্বতমালার এই অংশে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতশৃঙ্গ, বিশাল খাড়া পাহাড়ের দেয়াল এবং গভীর উপত্যকা। এখানকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন স্থানের উচ্চতার পার্থক্য প্রায় ৩,০০০ মিটার। এই অঞ্চলটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ। এখানে ৪,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার ৪৯টি পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে। এ কারণেই পর্বতারোহীরা এই অঞ্চলকে ইরানের আল্পস নামে অভিহিত করেন।
পূর্ব দিকে বিজান গিরিপথ এবং উত্তর, পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকে মারবার ও বাশার নদী এই সংরক্ষণ এলাকার সীমানা তৈরি করেছে। দেনার উত্তরাঞ্চলে মারবার নদী পূর্ব দিকে প্রবাহিত হয়েছে। কয়েকটি গ্রাম অতিক্রম করার পর নদীটি খোরসান গিরিপথে পৌঁছে খোরসান নদী নামে পরিচিত হয়। শেষ পর্যন্ত অপরূপ সৌন্দর্যের এক বনাঞ্চলীয় এলাকায় গিয়ে এটি বাশার নদীর সঙ্গে মিলিত হয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে গড়ে ১,৩০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকায় বছরের প্রথমার্ধে আবহাওয়া তুলনামূলকভাবে মৃদু থাকে। তবে সামগ্রিকভাবে এটি একটি শীতল ও আধা-আর্দ্র অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। তাই এখানকার প্রাকৃতিক আকর্ষণগুলো দেখার জন্য বসন্তের মাঝামাঝি সময় থেকে গ্রীষ্মের শেষভাগ পর্যন্ত সময়কে সবচেয়ে উপযুক্ত মনে করা হয়। এই অঞ্চলের গড় আর্দ্রতা প্রায় ৪৬ শতাংশ এবং বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৮২৩ মিলিমিটার। দেনা পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানির উৎস দক্ষিণ ইরানের পানীয় জল ও কৃষিকাজের চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দেনা পর্বতের ঢালে অসংখ্য ঝরনা রয়েছে। এমনকি শীতকালেও এসব ঝরনা তুষারের নিচ থেকে প্রবাহিত হয় এবং খাড়া পাহাড়ের ঢাল বেয়ে দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে। বিভিন্ন স্থানে এই জলধারাগুলো সৃষ্টি করেছে অপূর্ব সুন্দর সব জলপ্রপাত।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার উদ্ভিদ ও প্রাণীজগৎ
ভূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই অঞ্চলের প্রধান ভূমিরূপগুলোকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়:
-
- প্রথমত: অত্যন্ত উঁচু ও সুচালো পর্বতশৃঙ্গ, যেখানে উদ্ভিদের আবরণ খুবই সামান্য।
- দ্বিতীয়ত: উঁচু পাহাড়, যা বুনো পেস্তা গাছের আবরণে ঢাকা।
- তৃতীয়ত: উঁচু পাহাড়, যেখানে ওক ও বেনে গাছ রয়েছে।
- চতুর্থত: নদীর তীরবর্তী তৃণভূমি, যার কিছু অংশে কৃষিজ ফসল চাষ করা হয়।
- পঞ্চমত: মৃদু ঢালবিশিষ্ট ও নুড়িপাথরে আবৃত ভূমি, যেখানে প্রধানত ওক গাছের সমারোহ দেখা যায়।
- ষষ্ঠত: অসমতল ও নুড়িপাথরে আবৃত ভূমি, যেখানে স্বাভাবিকভাবে জন্মানো ঘাস বা বৃষ্টিনির্ভর ফসলের গাছপালা জন্মে।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর উদ্ভিদ বৈচিত্র্য। এখানে বনজ, তৃণভূমির, ঔষধি, খাদ্যোপযোগী ও শোভাবর্ধক বিভিন্ন ধরনের অসংখ্য উদ্ভিদ জন্মে। দেনার দক্ষিণ ঢালের ওক বন সমগ্র ইরানের মধ্যে অনন্য। এসব গাছের পাশাপাশি বেনে, কিকাম, আরজেন ও পাহাড়ি বাদামের মতো বিভিন্ন প্রজাতির গাছও এখানে দেখা যায়।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকায় জন্মানো কিছু প্রজাতির টিউলিপ এই অঞ্চলের নিজস্ব ও বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। সব মিলিয়ে এই অঞ্চলে প্রায় ৮৬০ প্রজাতির উদ্ভিদ পাওয়া যায়।
প্রাণী প্রজাতির দিক থেকেও দেনাকে ইরানের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সংরক্ষণ এলাকার উল্লেখযোগ্য প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে বড় আকারের বাদামি ভালুক, দারী তিতির (কেক্লিক) যার ওজন ৫ কেজি পর্যন্ত হতে পারে বিভিন্ন প্রজাতির ঈগল, চিতাবাঘ, নেকড়ে এবং বন্য বিড়াল। দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকায় এখন পর্যন্ত ৭টি বর্গের অন্তর্ভুক্ত ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৮৫ প্রজাতির পাখি, ২৫ প্রজাতির সরীসৃপ, ২ প্রজাতির উভচর, ৮ প্রজাতির মাছ এবং ৩০ প্রজাতির প্রজাপতি শনাক্ত করা হয়েছে।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকায় মানব কার্যক্রম ও জনবসতি
এই জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। তাদের অধিকাংশই এই অঞ্চলের দক্ষিণ অংশে বসবাস করেন। সিসাখত ও পাতাভে হলো এলাকার প্রধান শহর। আর কেরে, মেমান্দ, সিয়োর ও পাদনা হলো উল্লেখযোগ্য গ্রাম।
কৃষিকাজ, পশুপালন এবং দুগ্ধজাত পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ যার অধিকাংশই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে করা হয় এই সংরক্ষণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রধান পেশা। এছাড়াও, এলাকার আবহাওয়া এবং বিভিন্ন ধরনের ঔষধি উদ্ভিদের প্রাচুর্য মৌমাছি পালনের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে। ফলে দেনার মধু ইরানে উৎপাদিত উন্নতমানের মধুর অন্যতম হিসেবে পরিচিত। দেনা অঞ্চলে অল্পসংখ্যক যাযাবর জনগোষ্ঠীও বসবাস করে। এই এলাকায় তাদের উপস্থিতির ইতিহাস কয়েক হাজার বছরের পুরোনো বলে ধারণা করা হয়।
দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি
এই অঞ্চলটি ২০১০ খ্রিষ্টাব্দে ইউনেস্কোর জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই হিসেবে দেনা জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকা ছিল ইরানের দশম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকা এবং বিশ্বের ৫৫০তম জীবমণ্ডল সংরক্ষণ এলাকা। সমৃদ্ধ উদ্ভিদ ও প্রাণীসম্পদের কারণে এই অঞ্চলটি সংরক্ষিত। এখানে খনিজসম্পদ আহরণ বা শিকারের জন্য কোনো অনুমতি প্রদান করা হয় না।