এজেন্সি
বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগান, ৪০০ বছর আগের পানি প্রকৌশল জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগান, ৪০০ বছর আগের পানি প্রকৌশল জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগান, ৪০০ বছর আগের পানি প্রকৌশল জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।

ইরানি বাগান নামে ৯টি স্থাপনাকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এই মূল্যবান ঐতিহ্যকে বিশ্বের কাছে পরিচিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগান এই বাগানগুলোর অন্যতম, যা উত্তর ইরানে আলবোর্জ পর্বতমালার ঢালে অবস্থিত।

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগানের ইতিহাস

এই সুন্দর বাগান নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছিলেন সাফাভি শাসক শাহ আব্বাস (শাসনকাল: ১৫৮৭ থেকে ১৬২৯ খ্রিস্টাব্দ)। বাগানটি ১৬১১ ও ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে  নির্মিত হয়। এই বাগানকে ইরানের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক বাগান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি বেহশাহর শহর থেকে ৯ কিলোমিটার দূরে, ঘন জঙ্গলের মধ্যে অবস্থিত। বেহশাহর শহর থেকে এখানে যেতে হলে হাশেমিনেজাদ বুলেভার্ডে প্রবেশ করতে হয় এবং আব্বাসপুর হোটেলের আগে আব্বাসাবাদ সড়কের দিকে মোড় নিতে হয়। এই কমপ্লেক্সে রয়েছে বাঁধ ও বাঁধের জলাধার, ফুলের বাগান, প্রাসাদ, হাম্মাম (গোসলখানা), জলচালিত কল এবং দুটি ইটের টাওয়ার।

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগানের বিভিন্ন অংশ

এই কমপ্লেক্সের অন্যতম সুন্দর অংশ হলো ১০ হেক্টর আয়তনের একটি হ্রদ। বর্ষাকালে এই হ্রদের গভীরতা ১৮ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। হ্রদের পানি মূলত বৃষ্টির সময় প্রবাহিত জলধারা থেকে সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন খালের একটি ব্যবস্থার মাধ্যমে এই পানিকে জমা করা হয়। গ্রীষ্মকালে এই পানি আশপাশের ধানক্ষেত ও কৃষিজমিতে সেচের কাজে ব্যবহার করা হয়।

এই হ্রদের মাঝখানে একটি ইটের তৈরি স্থাপনা রয়েছে। হ্রদে পানি পূর্ণ হলে স্থাপনাটি পানির নিচে ডুবে যায় এবং শুধু এর ওপরের অংশটি পানির উপর একটি ভাসমান দ্বীপের মতো দেখা যায়। এই স্থাপনাটি মূলত একটি ভিত্তি, যার ওপর একসময় মাটির টালির ছাদযুক্ত কাঠের একটি ভবন নির্মিত ছিল। স্থাপনাটির উত্তর পাশে থাকা একটি কাঠের সেতুর মাধ্যমে হ্রদের মাঝখানের এই ভবনে যাওয়া যেত।

ধারণা করা হয়, এই স্থাপনাটি পানির মাঝখানে একটি বিনোদনমূলক আবাসস্থল হিসেবে নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নির্মাতারা অত্যন্ত নিখুঁত প্রকৌশল হিসাবের মাধ্যমে এটি তৈরি করেছিলেন, যাতে হ্রদের বাঁধের দেয়ালে পানির চাপ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বাঁধটিতে পানি নিষ্কাশনের জন্য তিনটি মুখ (দরজা) রয়েছে। তবে প্রকৌশলীদের হিসাব অনুযায়ী, হঠাৎ পানির চাপ বেড়ে গেলে শুধু এই মুখগুলোর মাধ্যমে পানি বের করলে বাঁধ ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারত। তাই পানি নিষ্কাশনের জন্য একটি সহায়ক ব্যবস্থা তৈরি করা হয়। এই ব্যবস্থাটি ছিল একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ, যার মুখ ছিল মধ্যবর্তী স্থাপনার কেন্দ্রীয় দেয়ালের অংশে। এই সুড়ঙ্গের মাধ্যমে পানি বাঁধের নিচের দিকে প্রবাহিত হতো। বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগানের বাঁধের ধারণক্ষমতা প্রায় ৬০০ হাজার ঘনমিটার এবং এটি একটি জলাধারভিত্তিক বাঁধ। এই বাঁধটি বাগানের অন্যান্য স্থাপনার সঙ্গে একই সময়ে সাফাভি যুগে নির্মিত হয়। বাঁধ নির্মাণে প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে পাথর, ইট ও সারুজ (প্রাচীন জলরোধী নির্মাণ উপাদান)



বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগানের হ্রদের বাঁধ ও মধ্যবর্তী স্থাপনা।

 

বাগানের পুরো এলাকাটি একটি টিলার ওপর নির্মাণ করা হয়েছে। বাগানটিকে আরও সুন্দর ও আকর্ষণীয় রূপ দেওয়ার জন্য টিলার ঢাল কেটে সেখানে সিঁড়ি ও সমতল ধাপ (প্ল্যাটফর্ম) তৈরি করা হয়েছিল। সেই সময়কার সীমিত সুযোগ-সুবিধার কথা বিবেচনা করলে এই বিশাল নির্মাণকাজ অত্যন্ত বিস্ময়কর। এ কারণে এটিকে সাফাভি যুগের প্রকৌশলীদের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও সাহসিকতার নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বাগানের নকশা সম্পূর্ণ সমমিত (প্রতিসাম্যপূর্ণ)। বাগানের ধাপযুক্ত কাঠামো এবং ঢালু অংশে মাটির তৈরি পাইপ ব্যবহারের ফলে সারা বাগানজুড়ে পানির প্রবাহের একটি সুরেলা ও প্রশান্তিদায়ক শব্দ সৃষ্টি হতো।

টিলার সর্বোচ্চ অংশে একটি ভবন নির্মাণ করা হয়েছিল। এই ভবনটি বাগানের উত্তর দিকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ছিল এবং সেখান থেকে বেহশাহর সমভূমি ও মিয়ানকালে উপসাগর দেখা যেত। বাগানের পশ্চিম অংশে একটি ঐতিহাসিক হাম্মাম (প্রাচীন গোসলখানা) নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রাচীন ইরানি হাম্মামগুলোর রীতির মতোই এই হাম্মামের মেঝে আশপাশের ভূমির তুলনায় নিচু রাখা হয়েছিল, যাতে সহজে পানি সরবরাহ করা যায় এবং মাটি প্রাকৃতিক নিরোধক হিসেবে কাজ করে ভেতরের তাপ ধরে রাখতে পারে।

এই হাম্মামের আয়তন ছিল ১৬০ বর্গমিটার। ধারণা করা হয়, এর ছাদ ছিল গম্বুজাকৃতির এবং এতে ইটের অলংকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। মাটির তৈরি পাইপের মাধ্যমে পূর্ব দিক থেকে পানি হাম্মামে প্রবেশ করত এবং উত্তর অংশ অতিক্রম করে পশ্চিম অংশে পৌঁছাত। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই হাম্মামে ঠান্ডা পানি ও গরম পানির জন্য দুটি পৃথক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ছিল, যা একই ধরনের নকশায় তৈরি করা হয়েছিল।

গরম কক্ষ (গরমখানা), যা গোসলের প্রধান স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো, সেখানে একাধিক পানির চৌবাচ্চা বা জলাধার নির্মাণ করা হয়েছিল। বাগানের মধ্যে পানি বণ্টনের জন্য একটি বিশেষ স্থান তৈরি করা হয়েছিল, যাকে গুলবাগ বলা হতো। এই অংশটি মূল বাগান এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ মিটার দূরে অবস্থিত ছিল। এটি নির্মাণের জন্য টিলার ভূমি এমনভাবে কেটে সমতল করা হয়েছিল, যাতে সেখানে একটি সমতল এলাকা তৈরি হয়। চারপাশ থেকে যে পানি বাগানের দিকে প্রবাহিত হতো, তা প্রথমে এই স্থানে জমা হতো, যাতে পানির গতি কমে যায় এবং তা পরিশোধিত হতে পারে। এরপর মাটির তৈরি পাইপের মাধ্যমে এই পানি বাগানের দিকে প্রবাহিত করা হতো।

গুলবাগের আয়তন প্রায় ৩৫০০ বর্গমিটার। এখানে দুটি ইটের তৈরি টাওয়ার দেখা যায়, যার প্রতিটির ব্যাস প্রায় ৭ মিটার এবং উচ্চতা ১৪ মিটার ছিল। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, পানি সংরক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে গুলবাগের গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে, এই দুটি টাওয়ার সম্ভবত প্রহরীদের অবস্থানের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে অন্য একটি মত হলো, টাওয়ারগুলোর দেয়াল মূলত পানির প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের কাজে ব্যবহৃত হতো। আর যদি সেখানে প্রহরী অবস্থান করত, তবে তাদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাগানের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

বাগানের দক্ষিণে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি জলচালিত কলকেও বাগানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এটি নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাগান থেকে প্রবাহিত পানির শক্তি ব্যবহার করা। এই কলটি একটি পাথর বিছানো পথের মাধ্যমে বাগানের সঙ্গে যুক্ত ছিল।

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগানের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন

এই ঐতিহাসিক কমপ্লেক্সটি ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় এর অন্তর্ভুক্তি ঘটে ২০১১ খ্রিস্টাব্দে। ওই বছর এই বাগানটি আরও আটটি বাগানের সঙ্গে ইরানি বাগান নামে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায়।

 

 

বেহশাহরের আব্বাসাবাদ বাগান, ৪০০ বছর আগের পানি প্রকৌশল জ্ঞানের এক অনন্য নিদর্শন।
মাজানদারান
বেহশহর
,Natural
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: