কুর্দিস্তান ইরানের অন্যতম সুন্দর অঞ্চল। কুর্দিস্তানের অনন্য প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর পাশাপাশি, যে বিষয়টি এই প্রদেশে ভ্রমণকে আরও আনন্দদায়ক করে তোলে, তা হলো এখানকার মানুষের আন্তরিকতা ও উষ্ণ আতিথেয়তা। এই মানুষগুলো শুধু পর্যটকদেরই নয়, পরিযায়ী পাখিদেরও অত্যন্ত উদারতা ও অতিথিপরায়ণতার সঙ্গে স্বাগত জানায়।
কুর্দিস্তান প্রদেশ প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পরিযায়ী পাখির আতিথেয়তা করে। এসব পাখির বেশিরভাগই জরিবার (জারিবার) হ্রদ-এর আশপাশে অথবা জলাভূমি ও বনাঞ্চলে কিছু সময়ের জন্য আশ্রয় নেয় এবং বিশ্রাম করে। পরিযায়ী পাখিদের আবাসস্থলগুলোর মধ্যে দারেহ তাফি গ্রাম প্রতি বছর সারস পাখিদের আগমনের জন্য বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। এ কারণেই গ্রামটি সারস পাখিদের গ্রাম নামে পরিচিত হয়েছে।
দারেহ তাফি কোথায় অবস্থিত?
দারেহ তাফি গ্রামটি কুর্দিস্তান প্রদেশের মারিভান জেলার অন্তর্গত। গ্রামটির জনসংখ্যা প্রায় ১,০০০ জন এবং সেখানে প্রায় ২৫০টি পরিবার বসবাস করে। গ্রামটি জরিবার হ্রদের তীরে অবস্থিত এবং মারিভান শহর থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫ কিলোমিটার।
জরিবার হলো ইরানের বৃহত্তম মিঠাপানির হ্রদ। হ্রদের কিছু অংশ, যার গভীরতা প্রায় ২ থেকে ৫.৫ মিটার, জলাভূমির আকৃতি ধারণ করেছে এবং সেখানে বিভিন্ন অনন্য প্রজাতির প্রাণীর বসবাসের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদ, জলাভূমি এবং আশপাশের নলখাগড়ার বনভূমি মিলিয়ে এর আয়তন প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার।
বৃষ্টির পানির প্রবাহের পাশাপাশি, হ্রদের তলদেশ থেকে সাধারণত যে প্রাকৃতিক ঝরনাগুলো উৎসারিত হয়, সেগুলোও হ্রদটির পানির জোগানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২০১১ খ্রিস্টাব্দে জরিবার হ্রদকে ইরানের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
জরিবার হ্রদের নিকটবর্তী হওয়ার পাশাপাশি, গ্রামটিতে থাকা বিশাল ও সুউচ্চ ওকগাছগুলোও সারস পাখিদের বহু বছর ধরে দারেহ তাফিকে তাদের মৌসুমি আবাস হিসেবে বেছে নেওয়ার অন্যতম কারণ। ওকগাছের ওপরের দিকের ডালগুলো যেগুলোর উচ্চতা সাধারণত মাটি থেকে ৫ মিটারেরও বেশি সারস পাখিদের বাসা তৈরির জন্য নিরাপদ ও উপযুক্ত স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
দারেহ তাফি গ্রামে সারস পাখি
ফারসি মাসের এসফান্দের শেষের দিক (মার্চের দ্বিতীয়ার্ধ) এবং বসন্ত ও গ্রীষ্মকাল হলো দারেহ তাফি গ্রামে সারস পাখিদের অবস্থানের সময়। দারেহ তাফি ও এর আশপাশের এলাকায় বসতি স্থাপনের পর আবহাওয়া ঠান্ডা হয়ে এলে সারস পাখিরা দক্ষিণের উষ্ণ অঞ্চলের দিকে পরিযান করে।
জরিবার হ্রদের সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি সারস পাখিদের ডিম পাড়া ও বংশবিস্তারের জন্য একটি আদর্শ স্থান। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, জরিবার হ্রদ পরিযায়ী পাখিদের জন্য অন্যতম সেরা আবাসস্থল হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই অঞ্চলে দূষণের মাত্রা এতটাই কম যে, এখনো পর্যন্ত আশপাশের পাখিদের উপনিবেশগুলোর মধ্যে রোগের কারণে পাখি মারা যাওয়ার কোনো ঘটনা রিপোর্ট করা হয়নি।
সারস পাখিদের নিয়ে বিশ্বাস ও লোককথা
দারেহ তাফি গ্রামের মানুষ সারস পাখিদের উপস্থিতিকে সৌভাগ্য, শান্তি ও সমৃদ্ধির লক্ষণ বলে মনে করেন। তাই তারা শুধু সারস পাখিদের জন্য বাসা তৈরির ব্যবস্থা করেন না, অনেক সময় এসব পাখির জন্য খাবারের ব্যবস্থাও করেন। কোনো সারস পাখি আহত হলে তারা তার চিকিৎসারও ব্যবস্থা করেন।
দারেহ তাফির বাসিন্দাদের বিশ্বাস, সারস পাখিদের ভালোভাবে আপ্যায়ন ও যত্ন করা হলে তারা পরের বছরও গ্রামে ফিরে আসবে এবং সঙ্গে আরও সারস পাখিকে নিয়ে আসবে!
বলা হয়, বহু বছর আগে গ্রামে মাত্র এক জোড়া সারস কিছুদিনের জন্য অবস্থান করেছিল এবং একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির ওপর বাসা বানিয়েছিল। গ্রামবাসীরা আশঙ্কা করেছিলেন, পাখি দুটি বৈদ্যুতিক তারে আটকে বিপদে পড়তে পারে। তাই তারা একটি লোহার খুঁটি স্থাপন করে তার ওপর একটি বাসা তৈরি করে দেন।
পরের বছর সেই সারস জোড়া আবার গ্রামে ফিরে আসে এবং তাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি সারসও নিয়ে আসে। এভাবে প্রতি বছর সারসের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গ্রামের তরুণরা তাদের আরও ভালোভাবে স্বাগত জানানোর জন্য আরও বেশি খুঁটি স্থাপন করেন এবং সেগুলোর ওপর কৃত্রিম বাসা তৈরি করতে থাকেন। এভাবেই আজ দারেহ তাফি পশ্চিম ইরানে সারস পাখিদের অন্যতম প্রধান আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।
দারেহ তাফির বাসিন্দারা সারস পাখিদের হাজি লাকলাক নামে অভিহিত করেন। ইরানিদের কাছে হাজি একটি সম্মানসূচক উপাধি, যা সাধারণত হজ পালন করে আসা ব্যক্তিদের দেওয়া হয়। ধারণা করা হয়, দারেহ তাফির সারস পাখিদের এই নামটি দেওয়ার পেছনে একটি লোকবিশ্বাস রয়েছে। গ্রামের কিছু মানুষ হজে যাওয়ার পথে সারস পাখিদের দেখতে পেতেন এবং মনে করতেন, পাখিরাও যেন হজের পথেই যাত্রা করছে!
এ থেকেই তাদের মধ্যে একটি লোকবিশ্বাস তৈরি হয় যে, সারস পাখিরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার পর হজ করতে যায় এবং পরের বছর আবার ফিরে আসে!
সারস পাখিদের আরেকটি নাম গ্রামের মানুষ হাজি তকতক বলে থাকেন। এর কারণ হলো, এসব পাখি কখনো কখনো তাদের ঠোঁট পরস্পরের সঙ্গে ঠুকরে একটি জোরালো শব্দ তৈরি করে, যা অনেক দূর থেকেও শোনা যায়।
দারেহ তাফি গ্রামের জাতীয় নিবন্ধন
২০২৪ খ্রিস্টাব্দে দারেহ তাফি গ্রামকে মারিভানের সারস পাখিদের আবাসস্থল হিসেবে ইরানের জাতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত করা হয়।