বাংলাদেশে রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ইরান রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎ
ঢাকা, ১০ আগস্ট ২০২৬: বাংলাদেশে রেড ক্রসের দুই প্রতিনিধি জনাব নিকোলাস ফ্লুরি হেড অব ডেলিগেশn, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (আইসিআরসি) ও অ্যাঞ্জেলিকা শপ, হেড অব অপারেশনস, বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি , ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত জনাব ড. জালিল রাহিমি জাহানাবাদি-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে ঢাকাস্থ ইরান দূতাবাসের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের কালচারাল কাউন্সেলর জনাব মাহদি মৌলায়ী আরানি এবং দূতাবাসের রাজনৈতিক বিষয়ক কর্মকর্তা জনাব ইসরাফিল আমিরিও উপস্থিত ছিলেন।
সাক্ষাতে পশ্চিম এশিয়ার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং এ অঞ্চলে রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের কার্যক্রম, মানবিক সহায়তা প্রদান ও মাঠপর্যায়ে কাজের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
রেড ক্রসের প্রতিনিধিরা পশ্চিম এশিয়ার চলমান পরিস্থিতিতে, বিশেষ করে গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁরা বলেন, গাজার পরিস্থিতি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং সেখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে গুরুতর প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। তাঁরা আরও জানান, ইরানে রেড ক্রসের কার্যক্রম ও প্রতিবেদন সম্পর্কে প্রত্যাশা ও মূল্যায়নের বিষয়টিও তাঁরা অবগত আছেন। তবে সংস্থাটির নীতিগত অবস্থান অনুযায়ী, তারা সাধারণত প্রকাশ্য অভিযোগ, তথ্য ফাঁস বা সরাসরি মুখোমুখি অবস্থানের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সংলাপ ও যোগাযোগের মাধ্যমে মানবিক বিষয়গুলো সমাধানের চেষ্টা করে।
এ সময় রেড ক্রসের প্রতিনিধিরা ইসরায়েলে তাদের কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে বিদ্যমান বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও সীমাবদ্ধতার বিষয়েও আলোচনা করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, প্রকাশ্য ও সংঘাতমুখী অবস্থান গ্রহণ করলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তাদের কার্যক্রম ও মানবিক সহায়তা প্রদানের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়তে পারে। সে কারণে সংলাপ, যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততাকে তাঁরা অধিক কার্যকর পন্থা হিসেবে বিবেচনা করেন।
রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের বক্তব্য শোনার পর রাষ্ট্রদূত ড. জালিল রাহিমি জাহানাবাদি পশ্চিম এশিয়ার বর্তমান সংকটের মূল কারণগুলো ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, এ অঞ্চলের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার পেছনে ক্ষমতার রাজনীতি, সম্প্রসারণবাদী আকাঙ্ক্ষা এবং বিভিন্ন ভূরাজনৈতিক স্বার্থ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মতো মানবিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, তাদের অন্যতম প্রধান শক্তি হলো বিশ্ব জনমত। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ শান্তি, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের পক্ষে অবস্থান করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উচিত বিশ্ব জনমতের শক্তিকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো এবং মানবিক মূল্যবোধ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করতে এর ভূমিকা জোরদার করা।
তিনি আরও বলেন, “এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক বিবেচনা প্রধান হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কার্যক্রমও বিভিন্ন স্বার্থের প্রভাবে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।”
রাষ্ট্রদূত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘটিত বিভিন্ন আগ্রাসন ও বৈরী কর্মকাণ্ডের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। পাশাপাশি তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংলাপ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে ইরানের বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি বিশেষভাবে বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আলোচনা চলাকালীনও ইরানের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক শান্তি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি গুরুতর চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করেছে।
রাষ্ট্রদূত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক নীতিমালার প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, বিদ্যালয়, হাসপাতাল, বেসামরিক এলাকা এবং ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্থাপনাসহ বেসামরিক অবকাঠামোর সুরক্ষা আন্তর্জাতিক আইনের অন্যতম মৌলিক নীতি। তিনি অভিযোগ করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতগুলোতে এই নীতিমালার গুরুতর লঙ্ঘন ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কার্যকর প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত বলেন, “দুঃখজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতিক্রিয়া উদ্বেগ ও নিন্দা প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষায় আরও কার্যকর ও বাস্তব পদক্ষেপ প্রয়োজন।”
বৈঠকের শেষ পর্যায়ে ইরানের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার ওপর সংঘটিত সাম্প্রতিক আগ্রাসনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা একটি বিশেষ আলোকচিত্র সংকলন “এস্তাদেহ দার ঘোবার” (ধুলোয় দাঁড়িয়ে থাকা) রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করেন রাষ্ট্রদূত ড. জালিল রাহিমি জাহানাবাদি। সংকলনটি ইরানের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উদ্যোগে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং দূতাবাসের মাধ্যমে প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
এ ছাড়া একই দপ্তরের পক্ষ থেকে সরবরাহ করা স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র “মাশকে নাতামাম” (অসমাপ্ত পাঠ)-ও রেড ক্রসের প্রতিনিধিদের কাছে প্রদান করা হয়।
সাক্ষাতে উভয় পক্ষ মানবিক মূল্যবোধ, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সংলাপ ও সহযোগিতা অব্যাহত রাখার গুরুত্বের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
.