কার্পেট জাদুঘর
ইরানে হাখামানেশি রাজবংশের সময়কার কার্পেট বুননের প্রাচীনত্বের কারণে একটি জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত স্পষ্ট ছিল। তেহরানের কার্পেট মিউজিয়ামটি ১৩৫৬ ইরানি সালে, বাহমান মাসের ২২ তারিখে নির্মিত হয়েছিল, যা হাতে বোনা কার্পেটের সবচেয়ে অভিজাত ও অমূল্য একটি সংগ্রশালার প্রতিনিধিত্ব করে। জাদুঘরের স্থাপত্যকর্ম অত্যন্ত দর্শনীয় এবং চমৎকার। জাদুঘরের সম্মুখভাগের বাইরের অলঙ্করণগুলো হুবহু কার্পেট বোনার তাঁতের মতো। জাদুঘরের প্রদর্শনী স্থলে দুটি হল রয়েছে যার প্রথমটি স্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য এবং দ্বিতীয় তলার হলটি কার্পেট এবং কিলিমের অস্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে।
9ম শতাব্দী থেকে সমসাময়িক কাল পর্যন্ত ইরানি কার্পেট এবং কিলিমের সবচেয়ে মূল্যবান নমুনাগুলো এখানে সেগুলোর গুণগত মান ও প্রাচীনত্ব এবং ইরানি কার্পেটের অন্যান্য বৈশিষ্ট্য, যেমন : রং,নকশা,প্যাটার্ন,বয়ন এবং কার্পেট বুনন কেন্দ্রের ভিন্নতার উপর ভিত্তি করে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। দ্বিতীয় তলার হলটিতে কাশান,কেরমান, ইসফাহান, তাবরিজ, খোরাসান,কুর্দিস্তান এবং অন্যান্য অঞ্চলের মতো প্রধান কেন্দ্রগুলোতে বোনা প্রায় 135টি ইরানি কার্পেটের মাস্টারপিস প্রদর্শিত হয়েছে। এই জাদুঘরে ফারসি, আরবি, ফরাসি, ইংরেজি এবং জার্মান ভাষার বিভিন্ন বইসহ একটি লাইব্রেরি এবং একটি বইয়ের দোকান রয়েছে।
এই বইগুলো বেশ গুরুত্বপূর্ণ এবং বিরল প্রকাশনা এবং সহজলভ্য ইরানি কার্পেট সম্পর্কে গবেষণার সংগ্রহ। উপরন্তু,এই সংগ্রহের মধ্যে ধর্ম,শিল্প ও সাহিত্য সংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক বইও রয়েছে। সেগুলো গবেষক,ছাত্র এবং শিল্পপ্রেমীদের জন্য সহজলভ্য এবং সংলগ্ন বইয়ের দোকানে কেনার জন্য কপি রয়েছে।
জাদুঘরে একটি কার্পেট সংস্কার ও মেরামতের দোকানও রয়েছে যা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত।
| কার্পেট জাদুঘর | |


ইরানের জাতীয় কার্পেট জাদুঘর: ইরানি ভূখণ্ডের শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন।
নিঃসন্দেহে, যদি আমরা ইরানি শিল্প নিয়ে গবেষণা করি, তাহলে কার্পেট (ফার্শ) তার অন্যতম সুন্দর ও পরিপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হবে। প্রাচীনকাল থেকেই ইরানিরা কার্পেট বুনন শিখেছে এবং বিভিন্ন যুগে এটিকে আরও উন্নত করেছে। ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ধরনের কার্পেট বোনা হয়েছে এবং প্রতিটি অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগুলো নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় লাভ করেছে। এভাবেই ইরানের সংস্কৃতি ও শিল্পকে বোঝার ক্ষেত্রে ইরানের কার্পেট জাদুঘরের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
ইরানের কার্পেট জাদুঘর, যা ১৯৭৯ সাল থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে, সেখানে ৩৪০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি প্রদর্শনী স্থানে বিভিন্ন ধরনের ইরানি কার্পেট দেখা যায়। এই জাদুঘরের ভবন নির্মাণের কাজ শুরু হয় ১৯৬১ সালে। প্রথমে এই ভবনটিকে একটি কার্পেট গ্যালারি হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছিল, কিন্তু এটি ১৫ বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। পরে সংস্কার ও ব্যাপক পরিবর্তনের পর এটিকে ইরানের কার্পেট জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়। এই স্থাপনার নকশাকার হলেন আব্দুল আজিজ ফারমানফারমায়ান। জাদুঘরের বিশেষ নকশা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যে বাইরে থেকে ভবনটি একটি কার্পেট বোনার তাঁত -এর মতো দেখতে লাগে। এটি স্থাপত্য উপাদানের একটি চমৎকার ও বুদ্ধিদীপ্ত ব্যবহার, যার মাধ্যমে ভবনটিকে ভেতরে প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলা হয়েছে।
ইরানের কার্পেট জাদুঘর কোন কোন অংশ নিয়ে গঠিত?
ইরানের কার্পেট জাদুঘরের দুই তলায় কার্পেট, গালিম (পাটি) এবং হাতে বোনা কার্পেট প্রদর্শিত হয়।
- প্রথম তলার হলটি স্থায়ী প্রদর্শনীর জন্য নির্ধারিত।
- দ্বিতীয় তলার হলটি অস্থায়ী কার্পেট প্রদর্শনী অথবা কার্পেট-সম্পর্কিত অন্যান্য সামগ্রীর প্রদর্শনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
প্রথম তলায় প্রায় ১৫০টি কার্পেট প্রদর্শনের ব্যবস্থা রয়েছে। সাধারণত এখানে ইরানি কার্পেট শিল্পের ১৩৫টি অনন্য ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শন দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন।

ইরানের কার্পেট জাদুঘর হলো কার্পেট, গালিম (পাটি) এবং হাতে বোনা কার্পেট তৈরির ক্ষেত্রে ইরানিদের শিল্পকলার প্রদর্শনস্থল।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, এখানে প্রদর্শিত প্রাচীনতম নিদর্শনগুলো সাফাভি যুগের (১৫০১–১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ) অন্তর্ভুক্ত। কখনো কখনো গুণগত মান ও নকশার দিক থেকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন কিছু আধুনিক কার্পেটও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। এই জাদুঘর পরিদর্শনের সময় কিছু বিরল ঐতিহ্যবাহী নকশা ও প্যাটার্ন দেখা যায়, যেখানে প্রতিকৃতি, বতে (Paisley নকশা), ত্রিভুজাকার সাইট্রন নকশা এবং বিভিন্ন প্রাণীর চিত্র ব্যবহার করা হয়েছে।
এই জাদুঘরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য আকর্ষণ হলো পোলিশ কার্পেটের সংগ্রহ। এগুলো সাফাভি যুগে পোল্যান্ডের রাজদরবারের আদেশে বোনা হয়েছিল। তাবরিজের মূল্যবান কার্পেট-চিত্র (তাবলোফরশ) এবং শাহনামা-এ বায়সানকরি-এর চিত্রসম্বলিত কার্পেটগুলো এই জাদুঘরের সবচেয়ে দর্শনীয় নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম।
ইরানি কার্পেট ও শিল্পকলার ওপর বিভিন্ন ভাষায় যেমন ফার্সি, ইংরেজি, আরবি, ফরাসি ও জার্মান প্রায় ৩৫০০টি বইয়ের সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার থাকা ইরানের কার্পেট জাদুঘরের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও এই জাদুঘরে একটি সিনেমা হল রয়েছে, যেখানে কার্পেট বুনন শিল্প এবং গালিমের নকশা তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন চলচ্চিত্র দেখার সুযোগ রয়েছে।
ইরানের কার্পেট জাদুঘরে সংরক্ষিত সামগ্রী
সাধারণভাবে ইরানের কার্পেট জাদুঘরের সমস্ত কার্পেটকে দুটি ভাগে ভাগ করা যায়:
- শহুরে কার্পেট (শহরবাফট): যেসব কার্পেট প্রধান কার্পেট বুনন কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শহরগুলোতে (যেমন কাশান, কেরমান, ইসফাহান, তাবরিজ, খোরাসান, কুর্দিস্তান ইত্যাদি) তৈরি হয়েছে।
- যাযাবর কার্পেট (আশায়েরি): যেসব কার্পেট বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাসকারী যাযাবর জনগোষ্ঠী তৈরি করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের শাহসাভান কার্পেট,
- পশ্চিমাঞ্চলের বখতিয়ারি, কুর্দি ও লুরি কার্পেট,
- উত্তর-পূর্বাঞ্চলের তুর্কমেন কার্পেট,
- দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বেলুচ কার্পেট।

ইরানের কার্পেট জাদুঘরের একটি প্রাচীন কার্পেটের ছবি, যা একজন গ্রাহকের অর্ডার অনুযায়ী এবং ব্যক্তিদের প্রতিকৃতি ব্যবহার করে বোনা হয়েছে।
এই জাদুঘরে কার্পেটের সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য হস্তশিল্পের নিদর্শনও দেখা যায়। এর মধ্যে রং করা ও রং প্রস্তুতকরণ অন্যতম। কার্পেট জাদুঘরে এই শিল্পে ব্যবহৃত কিছু প্রাকৃতিক উপকরণ প্রদর্শিত হয়েছে। রঙ করা সুতা, কার্পেট বুননের বিভিন্ন সরঞ্জাম এবং দাঁড়ানো ও শোয়া অবস্থায় ব্যবহৃত কার্পেটের তাঁত এসবও ইরানের কার্পেট জাদুঘর পরিদর্শনের সময় দেখা যায়। প্রথম তলার প্রধান হলের প্রবেশপথে কিছু নকশা রাখা হয়েছে, যেখানে ইরানের সবচেয়ে পরিচিত কার্পেট বুনন কেন্দ্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ইরানের কার্পেট জাদুঘর পরিদর্শনের মাধ্যমে কার্পেট বোনার পদ্ধতি সম্পর্কেও জানার সুযোগ রয়েছে।
ইরানের কার্পেট জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?
ইরানের কার্পেট জাদুঘর তেহরান শহরের মধ্যভাগে অবস্থিত হওয়ায় সেখানে সহজেই পৌঁছানো যায়। এই জাদুঘরটি তেহরানের অন্যতম বৃহৎ উদ্যান লালে পার্কের উত্তর পাশে নির্মিত হয়েছে।
| ইরানের জাতীয় কার্পেট জাদুঘর: ইরানি ভূখণ্ডের শিল্প ও সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতিফলন। | |
| তেহরান | |
| তেহরান | |
| Artistic |





