আসেফ প্রাসাদ বা কুর্দদের বাড়ি, ইরানের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর।
আসেফ ভাজিরি হাউস বা সংক্ষেপে ‘আসেফ প্রাসাদ’ হলো কাজার (কাজারি) যুগের (১৭৯৬ থেকে ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ) একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন, যা সানানদাজ শহরে অবস্থিত। বর্তমানে এটি কুর্দিস্তানের নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর বা ‘কুর্দ বাড়ি’ নামে পরিচিত। এই স্থাপনাটি ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহাসিক নিদর্শনের তালিকায় নিবন্ধিত হয় এবং এটি কুর্দ জনগণের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।

সানানদাজের কুর্দ বাড়ি (খানেহ কুর্দ) ইরানের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর।
এই সংগ্রহশালায় কুর্দিস্তানের মানুষের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের মূল্যবান নিদর্শনগুলো সাধারণ দর্শনার্থীদের দেখার জন্য প্রদর্শিত হয়েছে। এই প্রাসাদটি সানানদাজ জামে মসজিদের নিকটে অবস্থিত। ঐতিহাসিক গুরুত্বের পাশাপাশি, এই মসজিদটি শহরের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত।

সানানদাজের কুর্দ বাড়ির সুন্দর স্থাপত্যের একটি অংশ।
আসেফ প্রাসাদের ইতিহাস
এই ভবনটির নির্মাণ শুরু করেন মির্জা আলী নকী খান লশকরনবিস। তাঁর উপাধি “আসেফ আজম”-এর কারণে এই স্থাপনাটির নামকরণ করা হয়েছে। তিনি সাফাভি যুগের শেষভাগে (১৫০১ থেকে ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ) এই প্রাসাদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। এই সময়ে ভবনের উত্তর অংশ যার মধ্যে ছিল আনুষ্ঠানিক সভাকক্ষ, কক্ষসমূহ এবং উভয় পাশের করিডোর এবং পূর্ব অংশের কিছু স্থান নির্মিত হয়।
পরবর্তী সময়ে এই ভবনে নিম্নলিখিত অংশগুলো যুক্ত করা হয়:
- কাজারি শাসনের প্রথমার্ধে, বাইরের আঙিনার পূর্ব ও পশ্চিম অংশ এবং প্রাসাদের হাম্মাম (গোসলখানা) নির্মাণ করা হয়।
- ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, অভ্যন্তরীণ অংশ (আন্দরুনি), প্রবেশপথের অর্ধ-অষ্টভুজাকার বারান্দা এবং আনুষ্ঠানিক সভাকক্ষের পশ্চিম অংশ পুনর্নির্মাণ করা হয়।
- ১৯৯৯ থেকে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে, পুরো প্রাসাদটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। এই সংস্কারের সময় আঙিনার মেঝের সব পাথরের পাটাতন পরিবর্তন করা হয় এবং কর্মচারীদের আঙিনাকে বর্তমান রূপ দেওয়া হয়।
আসেফ প্রাসাদের স্থাপত্য
কুর্দ বাড়িটির আয়তন প্রায় চার হাজার বর্গমিটার। এই স্থাপনায় বাইরের আঙিনা, অভ্যন্তরীণ অংশ, রান্নাঘর, কর্মচারীদের জন্য কক্ষ, একটি অর্ধ-অষ্টভুজাকার প্রবেশদ্বার, প্রবেশ করিডোর এবং পানি বণ্টনের জন্য একটি বিশেষ কক্ষ রয়েছে।

সানানদাজের কুর্দ বাড়ির রান্নাঘরের প্রবেশদ্বার।
আসেফ প্রাসাদের বাইরের আঙিনা
বাইরের আঙিনাটি এই ভবনের প্রধান আঙিনা হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি আয়তাকার আকৃতির, যেখানে দুটি বারান্দা, একটি জলাধার (ফোয়ারা) এবং বাগানসহ সুন্দরভাবে নির্মিত হয়েছে। এই আঙিনার নকশা চাহারবাগ (চার বাগান) পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়েছে।
আঙিনার উত্তর দিকে অবস্থিত প্রধান হলটি অনন্য গচকাজ (প্লাস্টার অলংকরণ), মুকারনাস (স্তরবিন্যস্ত অলংকারশৈলী) এবং সুন্দর ওরসি (রঙিন কাচের নকশাযুক্ত জানালা) দিয়ে সজ্জিত।
এই একই আঙিনার পূর্ব অংশে একটি করিডোর, দুটি কক্ষ এবং একটি চার দরজাবিশিষ্ট কক্ষ রয়েছে। আঙিনার পশ্চিম পাশে সারিবদ্ধ স্তম্ভযুক্ত একটি দীর্ঘ বারান্দা রয়েছে। এই বারান্দার পেছনে একটি সুন্দর ওরসি-যুক্ত হল রয়েছে, যেখানে মনোমুগ্ধকর ইসলিমি (আরবেস্ক) নকশা দেখা যায়। এই ওরসির দুই পাশে দুটি কক্ষ অবস্থিত।

সানানদাজের কুর্দ বাড়ির আয়নাকাজের একটি দৃশ্য।
আসেফ প্রাসাদের হাম্মাম (গোসলখানা)
বাইরের আঙিনায় অবস্থিত এই হাম্মামটি সানানদাজের সবচেয়ে সুন্দর ঐতিহাসিক হাম্মাম হিসেবে বিবেচিত হয়। খোদাই করা পাথরের স্তম্ভ, চুনের কারুকাজ এবং সুন্দর টাইলসের অলংকরণ এই হাম্মামটিকে অনন্য সৌন্দর্য দিয়েছে।
আসেফ প্রাসাদের অভ্যন্তরীণ আঙিনা
মূল ভবনের তুলনায় অভ্যন্তরীণ আঙিনাটি কিছুটা নতুন। এই অংশটি পাহলভি যুগের শুরুর দিকে কুর্দিস্তানের স্থানীয় স্থাপত্যশৈলী বিবেচনায় রেখে নির্মাণ করা হয়। এটি দুই তলাবিশিষ্ট, যার মধ্যে একটি ভূগর্ভস্থ তলা এবং ছয়টি কাঠের স্তম্ভ ও গচকাজে (প্লাস্টার অলংকরণ) সজ্জিত একটি বারান্দা রয়েছে। এই আঙিনায় একটি হীরার আকৃতির জলাধার এবং চারপাশে বাগান রয়েছে।
আসেফ প্রাসাদের দক্ষিণ আঙিনা
প্রাসাদের দক্ষিণ পাশে একটি ছোট আঙিনা রয়েছে, যা রান্নাঘরের আঙিনা নামে পরিচিত। এখানে একটি পাথরের জলাধারও রয়েছে।
পানি বণ্টনের কক্ষ
যেহেতু প্রাসাদের ব্যবহৃত পানি সানানদাজের পশ্চিম দিকের একটি কানাত (ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ) থেকে সরবরাহ করা হতো, তাই প্রবেশ করিডোরের পাশে একটি বিশেষ কক্ষ নির্মাণ করা হয়, যা “পানি বণ্টনের কক্ষ” নামে পরিচিত। এই কক্ষটি পানির সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও বণ্টনের জন্য ব্যবহৃত হতো।
কুর্দ বাড়ির বিশেষ স্থাপত্য, যা কুর্দিস্তানের আবহাওয়ার উপযোগী
কুর্দ বাড়ির স্থাপত্য সানানদাজের ঠান্ডা ও পাহাড়ি আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ভবনটির বর্গাকার কাঠামো এবং বিভিন্ন অংশের ঘন বিন্যাস তাপের অপচয় কমায় এবং ঘরকে উষ্ণ রাখতে সাহায্য করে। ভবনটির উত্তরমুখী নির্মাণের কারণে এতে সর্বাধিক আলো ও তাপ প্রবেশ করে। প্রাসাদের কিছু অংশের, বিশেষ করে উত্তর দিকের ভবনের (শাহনশিন) ছাদ দ্বিস্তরবিশিষ্টভাবে নির্মিত হয়েছে, যা সাধারণত অন্যান্য অংশের তুলনায় বেশি উষ্ণ থাকে।
আসেফ প্রাসাদ থেকে কুর্দ বাড়িতে রূপান্তর
আসেফ প্রাসাদকে কুর্দ অধ্যুষিত অঞ্চলের নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘরে রূপান্তর করার পর এটি “কুর্দ বাড়ি” নামেও পরিচিত হয়। কুর্দ বাড়ি ইরানে কোনো একটি জাতিগোষ্ঠী সম্পর্কিত সবচেয়ে বড় নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর। এটি পরিদর্শন করা অত্যন্ত আনন্দদায়ক ও জ্ঞানবর্ধক।
এই জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ হলো
চিত্রশালা (গ্যালারি), নগরজীবন সম্পর্কিত প্রদর্শনী, ঐতিহ্যবাহী পাঠশালা (মক্তবখানা) , ক্রোশে/হস্তশিল্প বিভাগ, অলংকার বিভাগ, কৃষি বিভাগ, পেশা ও কারিগরি বিভাগ, ঐতিহাসিক দলিল ও ছবির বিভাগ, খানের কক্ষ, পোশাক বিভাগ, শিকার বিভাগ, হস্তশিল্প বিভাগ, গ্রামীণ রান্নাঘর, গ্রন্থাগার ও দলিল সংরক্ষণ কেন্দ্র।
| আসেফ প্রাসাদ বা কুর্দদের বাড়ি, ইরানের জাতিগোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে বড় নৃ-তাত্ত্বিক জাদুঘর। | |
| কুর্দিস্তান | |
| সানন্দজ | |
| Social |









