এজেন্সি
শিরাজের খাতাম জাদুঘর: খাতাম শিল্পের বিকাশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের এক অনন্য সুযোগ।

শিরাজের খাতাম জাদুঘর: খাতাম শিল্পের বিকাশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের এক অনন্য সুযোগ।

শিরাজের খাতাম জাদুঘর: খাতাম শিল্পের বিকাশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের এক অনন্য সুযোগ।

খাতামকারি ইরানের অন্যতম সূক্ষ্ম ও ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প। এই শিল্পে কাঠের বিভিন্ন বস্তু ছোট ছোট ত্রিভুজাকৃতির কাঠ, হাড়, হাতির দাঁত ও ধাতুর টুকরো দিয়ে মোজাইক নকশায় অলংকৃত করা হয়। এই শিল্পের বিকাশ ও শ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলো প্রদর্শনের জন্য শিরাজের অন্যতম প্রাচীন এলাকায় খাতাম জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

শিরাজ: খাতামকারির শহর

খাতামকারির প্রধান উপকরণ হলো কাঠ, হাতির দাঁত, হাড়, পিতল এবং সোনা। খাতামকারির নকশা যত সূক্ষ্ম ও নিখুঁত হয়, তার মূল্যও তত বেশি হয়। শিরাজের খাতামকারি ইরানের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও প্রাচীন খাতাম শিল্পের অন্যতম হিসেবে পরিচিত। এর ইতিহাস এক হাজার বছরেরও বেশি পুরোনো। প্রায় এক হাজার বছরের পুরোনো আতিক জামে মসজিদের খাতামকারি করা মিম্বর শিরাজের অন্যতম মূল্যবান খাতাম শিল্পকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও বিষয়টি নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত নয়, তবুও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন যে খাতামকারি শিল্পের উৎপত্তিস্থল শিরাজ

খাতামকারির বিকাশ

সাফাভি যুগে (১৫০১–১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ) খাতামকারি শিল্প সর্বোচ্চ উৎকর্ষ লাভ করে। সে সময় ইসফাহানে খাতামকার শিল্পীরা একত্রিত হয়েছিলেন এবং ইরানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু শিক্ষার্থী এই শিল্প শেখার জন্য সেখানে আসতেন। তবে কাজার আমলে (ঊনবিংশ শতাব্দী) খাতামকারির প্রতি আগ্রহ কমে যায়। পরে বিংশ শতাব্দীতে মাদ্রাসা-এ সানায়ে মোস্তাযরাফে (চারুকলা বিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের দক্ষ কারিগর তৈরি হয় এবং খাতামকারি শিল্প নতুন প্রাণ ফিরে পায়। বর্তমানে খাতামকারি ইরানের অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী শিল্প। অধিকাংশ বিদেশি পর্যটক ইরান ভ্রমণের স্মারক হিসেবে খাতামকারির তৈরি কোনো না কোনো শিল্পপণ্য সঙ্গে নিয়ে যান।

শিরাজের খাতাম জাদুঘরের ইতিহাস

শিরাজের খাতাম জাদুঘর একটি ঐতিহাসিক ভবনে প্রতিষ্ঠিত, যার নাম সা'আদাত হাউস (খানে-য়ে সা'আদাত)। এই বাড়িটি আলি আকবর সা'আদাত নামে একজন ব্যক্তির নির্মিত হওয়ায় তাঁর নামানুসারেই এর নামকরণ করা হয়েছে। আলি আকবর সা'আদাত ছিলেন শিরাজের একজন খ্যাতনামা ব্যবসায়ী। তিনি শহরের প্রাচীন সাং-এ সিয়াহ (কালো পাথর) এলাকায় এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

এই ঐতিহাসিক ভবনটি ২০০৩ সালে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর ২০০৫ সালে ভবনটির সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের জন্য সংস্কারকাজ শুরু হয় এবং এর বিভিন্ন অংশ পুনর্নির্মাণ ও মেরামত করা হয়।

শিরাজের খাতাম জাদুঘরের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

শিরাজের খাতাম জাদুঘর তার অনন্য স্থাপত্যশৈলী এবং নান্দনিক অলংকরণের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। বাড়িটিতে একাধিক প্রশস্ত কক্ষ রয়েছে, যার প্রতিটির সজ্জা অত্যন্ত সুন্দর ও আকর্ষণীয়। এই বিশেষ স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই সা'আদাত হাউসকে খাতাম জাদুঘরে রূপান্তর করা হয়েছে। এখানে শিরাজের ঐতিহ্যবাহী খাতামকারি শিল্পের মূল্যবান নিদর্শন প্রদর্শিত হয়।

বাড়ির বিভিন্ন অংশে সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য টাইলসের কাজ, অলংকারমূলক ইটের নকশা, জ্যামিতিক কাঠের কারুকাজ (গিরেহচিনি) এবং খোদাইকরা পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ছাদ নির্মাণে কাঠের ব্যবহার ভবনটিকে একটি স্বতন্ত্র সৌন্দর্য দিয়েছে। স্তম্ভ ও দেয়ালে রাজা এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিদের চিত্র টাইলসের কাজ ও চিত্রাঙ্কনের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

খাতাম জাদুঘরটি সিবাওয়াইহের সমাধির পাশেই অবস্থিত। বাড়ির সব কক্ষ একটি কেন্দ্রীয় আঙিনাকে ঘিরে নির্মিত। ঐতিহ্যবাহী ইরানি বাড়ির আদলে তৈরি এই মনোরম আঙিনার মাঝখানে একটি ছোট জলাধার রয়েছে, যার চারপাশে ছোট ছোট ফুলের বাগান করা হয়েছে। আঙিনাকে ঘিরে তিন-দরজাবিশিষ্ট ও পাঁচ-দরজাবিশিষ্ট কক্ষগুলো অবস্থিত।

আঙিনার সামগ্রিক নকশা চতুষ্কোণ হলেও মাঝের জলাধারটি ডিম্বাকৃতির। কাজার যুগের বাড়িগুলোতে ডিম্বাকৃতির জলাধার খুব একটা প্রচলিত ছিল না। তাই এটিকে সা'আদাত হাউসের অন্যতম স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য হিসেবে ধরা হয়।

ভবনের উত্তর পাশে পাঁচ-দরজাবিশিষ্ট কক্ষগুলো নির্মিত হয়েছে। এই কক্ষগুলোর কাঠের ছাদ এবং রঙিন কাঁচের জানালার সমন্বয় এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। কক্ষগুলোর সামনে আটটি স্তম্ভবিশিষ্ট একটি বারান্দা রয়েছে এবং সব স্তম্ভেই সূক্ষ্ম প্লাস্টারের কারুকাজ করা হয়েছে।

ভবনের পশ্চিম পাশে তিন-দরজাবিশিষ্ট কক্ষ এবং নিচতলার ঘরগুলো অবস্থিত। অতীতে এই অংশটি শীতকালে পরিবারের সদস্যদের বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হতো।

এই বাড়ির দুটি প্রবেশপথ রয়েছে। প্রধান প্রবেশপথটি দক্ষিণ দিকে এবং দ্বিতীয় প্রবেশপথটি ভবনের পূর্ব পাশে, প্রধান প্রবেশপথের ধারাবাহিকতায় অবস্থিত। একই সময়ের অধিকাংশ ঐতিহাসিক বাড়িতে প্রবেশদ্বারের পর একটি হাশতি (অষ্টভুজাকৃতি প্রবেশকক্ষ) থাকলেও, এই বাড়িতে তা নেই। বরং একটি ছোট করিডরের মাধ্যমে সরাসরি আঙিনায় প্রবেশ করা যায়।

শিরাজের খাতাম জাদুঘরের সংগ্রহ

এই জাদুঘরে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত ব্যবহৃত খাতামকারির ঐতিহ্যবাহী সরঞ্জাম এবং খাতাম শিল্পের বিভিন্ন নিদর্শন প্রদর্শিত হয়েছে। এছাড়া খাতামকারির প্রাচীন ও খ্যাতিমান কারিগরদের ছবিও এখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

দর্শনার্থীরা জাদুঘরে খাতামকারি শিল্পকর্ম তৈরির বিভিন্ন ধাপ সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন, যা এই ঐতিহ্যবাহী শিল্পের কৌশল ও বিকাশ সম্পর্কে বাস্তব ধারণা প্রদান করে।

শিরাজের খাতাম জাদুঘর: খাতাম শিল্পের বিকাশ ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়ের এক অনন্য সুযোগ।
ফার্স
শিরাজ
Artistic

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: