আজারবাইজান জাদুঘরে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সমকালীন বিশ্বের পথে এক ঐতিহাসিক ভ্রমণ
আজারবাইজান জাদুঘর তাবরিজ শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এবং এটি ইরানের প্রাচীনতম জাদুঘরগুলোর একটি। আয়তনের দিক থেকে এটি ইরানের জাতীয় জাদুঘরের পর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর। এখানে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুগের অসংখ্য মূল্যবান ও দৃষ্টিনন্দন প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে।
আজারবাইজান জাদুঘরের ইতিহাস
ইরানের অনেক জাদুঘরই এমন ঐতিহাসিক বাড়ি বা ভবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যেগুলো আগে অন্য কাজে ব্যবহৃত হতো। কিন্তু আজারবাইজান জাদুঘরের ভবনটি শুরু থেকেই একটি জাদুঘর হিসেবে নির্মাণের উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হয়েছিল এবং সেই লক্ষ্য অনুযায়ী এর নকশা ও স্থাপত্য প্রস্তুত করা হয়।
এই জাদুঘরের নকশা প্রণয়ন করেন খ্যাতনামা ফরাসি প্রত্নতত্ত্ববিদ আন্দ্রে গদার (১৮৮১–১৯৬৫)। তিনি প্রায় পঁচিশ বছর ইরানে বসবাস করেন এবং একসময় তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইরানে অবস্থানকালে গদার বহু গুরুত্বপূর্ণ ভবনের নকশা তৈরি করেন, যেগুলোর প্রত্যেকটি আজ ইরানের উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য ও দর্শনীয় নিদর্শনের অন্তর্ভুক্ত।
এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার ধারণার সূত্রপাত হয় ১৯২৮ সালে তাবরিজের তারবিয়াত গ্রন্থাগারের প্রদর্শনী কক্ষে আয়োজিত একটি প্রদর্শনীর সময়। ওই প্রদর্শনীতে তাবরিজ শহরে আবিষ্কৃত কয়েকটি প্রাচীন মুদ্রা প্রদর্শিত হলে শহরের একদল সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নেন যে, তাবরিজে আবিষ্কৃত প্রত্ননিদর্শন স্থায়ীভাবে প্রদর্শনের জন্য একটি বিশেষ জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা উচিত। তবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হতে কয়েক বছর সময় লাগে এবং শেষ পর্যন্ত ১৯৬২ সালে জাদুঘরটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।
আজারবাইজান জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য ও স্থাপত্য
এই জাদুঘরের ভবনের আয়তন প্রায় ২,৪০০ বর্গমিটার। ভবনটি তিনতলা বিশিষ্ট এবং প্রতিটি তলায় প্রায় ৮০০ বর্গমিটার আয়তনের একটি করে প্রদর্শনী হল রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন ধরনের প্রত্ননিদর্শন প্রদর্শিত হয়।
আজারবাইজান জাদুঘরে ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকে শুরু করে ইসলামি যুগ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ের নিদর্শন সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে মোট প্রায় ১২ হাজার প্রত্নবস্তু রয়েছে, যার মধ্যে ২,৩০০টি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় নিবন্ধিত।
আজারবাইজান জাদুঘরের ভূতল ও বেসমেন্ট
এই অংশে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ইরানে ইসলামের আগমন পর্যন্ত সময়ের নিদর্শন প্রদর্শিত হয়েছে। এখানে প্রদর্শিত উল্লেখযোগ্য প্রত্নবস্তুর মধ্যে রয়েছে সাত হাজার বছর প্রাচীন ইসমাইলাবাদ টিলার মৃৎপাত্র এবং জিরফত থেকে আবিষ্কৃত সারপেনটাইন (সোপস্টোন) পাথরের শিল্পকর্ম, যার গায়ে উদ্ভিদ ও প্রাণীর নকশা খোদাই করা আছে। এছাড়া প্রায় তিন হাজার বছর পুরোনো এক নারীর মূর্তি এবং খ্রিস্টপূর্ব যুগের বিভিন্ন পাত্রও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।
জাদুঘরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় নিদর্শনগুলোর একটি হলো একজন নারী ও একজন পুরুষের সংরক্ষিত দেহাবশেষ। এগুলো ১৯৯৯ সালে কাবুদ (নীল) মসজিদের আশপাশে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সময় উদ্ধার করা হয় এবং এগুলোর সময়কাল খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দ বলে নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই অংশের উত্তর দেয়ালে ‘বিসমিল্লাহ’ পাথর নামে পরিচিত একটি বিশাল শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়েছে। সমকালীন ইরানের একজন শিল্পীর নির্মিত এই পাথরখোদাই শিল্পকর্মটি আধুনিক শৈলীর একটি অনন্য শিলালিপি হিসেবে বিবেচিত হয়।
আজারবাইজান জাদুঘরের প্রথম তলা
ইসলাম-পরবর্তী যুগের নিদর্শন দেখতে হলে এই তলায় যেতে হয়। এই বিভাগের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শনগুলো ৯ম শতাব্দীর এবং এগুলো নিশাপুর শহরের আশপাশের এলাকা থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে। এসব নিদর্শনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো সাদা গ্লেজের ব্যবহার এবং ইসলামী ও কুফি নকশা-অলংকরণ। পাত্রের সাজসজ্জায় এই ধারার পরিবর্তন কাজার (কাজারি) যুগ পর্যন্ত লক্ষ্য করা যায়।
এই বিভাগে ইরানের বিভিন্ন শাসনামলে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে শুরু করে কাজার যুগ (১৯শ শতাব্দী) পর্যন্ত প্রচলিত মুদ্রাগুলোও দেখা যায়। এছাড়া বিভিন্ন যুগের মৃৎপাত্র, প্রাচীন সিলমোহর, কয়েকটি সমাধিফলক, মানবমূর্তি ও ভাস্কর্য এবং শিলালিপিযুক্ত কয়েকটি পাথর এখানে প্রদর্শিত হয়েছে।
এই বিভাগের অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন হলো একটি কোডযুক্ত তালা, যা ১১শ শতাব্দীর শেষভাগে তৈরি করা হয়েছিল। প্রায় ৯০০ বছর পুরোনো এই তালায় ব্যবহৃত প্রযুক্তি অত্যন্ত বিস্ময়কর ও সৃজনশীলতার পরিচয় বহন করে।
| আজারবাইজান জাদুঘরে প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে সমকালীন বিশ্বের পথে এক ঐতিহাসিক ভ্রমণ | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| তাবরিজ | |

























