এজেন্সি
তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘর: মানুষের উদ্ভাবিত আকর্ষণীয় পরিমাপক যন্ত্রের এক অনন্য প্রদর্শনী

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘর: মানুষের উদ্ভাবিত আকর্ষণীয় পরিমাপক যন্ত্রের এক অনন্য প্রদর্শনী

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘর: মানুষের উদ্ভাবিত আকর্ষণীয় পরিমাপক যন্ত্রের এক অনন্য প্রদর্শনী

তাবরিজ তার ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছিল। প্রকৃতপক্ষে ইউরোপ ও রাশিয়া থেকে আসা বিশ্বের আধুনিক প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ইরানে প্রবেশের অন্যতম প্রবেশদ্বার ছিল তাবরিজ। এ কারণেই ইরানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাসে অনেক ক্ষেত্রেই তাবরিজ ‘প্রথম’ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

তাবরিজের একটি পুরোনো ঐতিহাসিক বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত পরিমাপ জাদুঘরটি অতীত যুগে ব্যবহৃত বিভিন্ন পরিমাপক ও মাপজোকের যন্ত্র প্রদর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। এসব যন্ত্রের মধ্যে কিছু, যেমন ইউরোপ থেকে ইরানে আসা প্রথম দিকের ঘড়িগুলো, প্রথমবারের মতো তাবরিজেই ব্যবহার করা হয়েছিল।

সেলমাসি বাড়ি ও পরিমাপ জাদুঘরে এর রূপান্তর

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘরটি সেলমাসি বাড়ি নামে পরিচিত একটি পুরোনো ঐতিহাসিক ভবনে অবস্থিত। এই বাড়িটি কাজার যুগের মাঝামাঝি সময়ে, ১৮৭৪ সালে (১২৫৩ হিজরি শামসি) নির্মিত হয়। এটি তাবরিজ শহরের প্রাচীন এলাকা মাকসুদিয়া মহল্লায় অবস্থিত, যেখানে বহু ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে।

সেলমাসি বাড়ির পাশেই রয়েছে বিখ্যাত পৌরসভা ভবন, যা ঘড়ি টাওয়ার ভবন নামেও পরিচিত। এই টাওয়ারটির উচ্চতা ৩০ মিটারেরও বেশি এবং এর চূড়ায় একটি বড় ঘড়ি স্থাপন করা আছে। ঘড়িটিতে চারটি দিক বা মুখ রয়েছে, যাতে শহরের চার দিকের মানুষ সহজেই সময় দেখতে পারেন। প্রতি ১৫ মিনিট পরপর এই ঘড়ি ঘণ্টাধ্বনি দিয়ে শহরবাসীকে সময় জানান দেয়।

১৯৯৫ সালে (১৩৭৪ হিজরি শামসি) সেলমাসি বাড়িটির সংস্কারকাজ করা হয় এবং ছয় বছর পর এটি তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘর হিসেবে চালু হয়। বর্তমানে বাড়িটির পশ্চিম, পূর্ব ও উত্তর অংশে জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ স্থাপন করা হয়েছে। এর মোট আয়তন প্রায় ৮৭৫ বর্গমিটার

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগ

পরিমাপ ও মাপজোকের গুরুত্ব এতটাই বেশি যে মানুষের জীবন এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন বিষয় পরিমাপ করার জন্য নানা ধরনের যন্ত্র তৈরি করে আসছে। এসব যন্ত্রের মধ্যে অনেকগুলোকে এতটাই নিখুঁত হতে হতো যে সামান্য ওজনের পার্থক্য বা তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তনও তারা শনাক্ত করতে পারত। এ কারণে প্রাচীন যুগের অন্যতম নির্ভুল বিজ্ঞান ছিল পরিমাপবিদ্যা। এসব যন্ত্র তৈরিতে সেই সময়ের সর্বাধুনিক বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার করা হতো।

প্রধান প্রদর্শনী কক্ষ

প্রথম কক্ষ:

এই কক্ষে সময় পরিমাপের বিভিন্ন যন্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে। এর মধ্যে কাজার যুগের (১৯শ শতাব্দী) সমতল অ্যাস্ট্রোল্যাব এবং পিতলের তৈরি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক গোলক উল্লেখযোগ্য। এসব যন্ত্র ব্যবহার করা হতো জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, পঞ্জিকা বা ক্যালেন্ডার নির্ধারণ, পৃথিবী ও সূর্য এবং অন্যান্য গ্রহের দূরত্ব হিসাব, চন্দ্রগ্রহণ ও সূর্যগ্রহণের সময় নির্ণয়, নামাজের সময় নির্ধারণ, প্রধান ও উপদিক চিহ্নিত করা, কিবলার দিক নির্ধারণ এবং ভবিষ্যতের সপ্তাহ ও মাসে রৌদ্রোজ্জ্বল বা বৃষ্টিময় দিনের হিসাব করার কাজে।

দ্বিতীয় কক্ষ:

এই কক্ষটি আকাশ পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত যন্ত্রের জন্য নির্ধারিত। এখানে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশ থেকে ইরানে আসা বেশ কিছু টেলিস্কোপ প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি ঐতিহাসিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পরিমাপক যন্ত্র সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও ঐতিহাসিক তথ্যসম্বলিত বিভিন্ন ফলকও দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে।

অন্য তিনটি কক্ষ:

জাদুঘরের আরও তিনটি কক্ষে বিভিন্ন ধরনের পুরোনো ঘড়ি প্রদর্শন করা হয়েছে। এসব ঘড়ির অধিকাংশই জার্মানি, ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডে তৈরি। এগুলো ব্রোঞ্জ ও পিতলের তৈরি এবং অনেকগুলোর ওপর সোনা বা কাঠের আবরণ রয়েছে। কিছু ঘড়িতে এনামেল ও সিরামিকের অলংকরণও দেখা যায়। প্রদর্শিত কয়েকটি ঘড়ির বয়স ২০০ বছরেরও বেশি।

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘরের ভূগর্ভস্থ অংশ

জাদুঘরের ভূগর্ভস্থ অংশে আধুনিক পরিমাপক যন্ত্রের সংগ্রহ প্রদর্শিত হয়েছে। এখানে রয়েছে সূক্ষ্ম স্বর্ণকারের দাঁড়িপাল্লা, রাশিয়ান ঢালাই লোহার টেবিল দাঁড়িপাল্লা (যা খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী ওজন করতে ব্যবহৃত হতো), পরীক্ষাগারের চিকিৎসা কাজে ব্যবহৃত দাঁড়িপাল্লা, নবজাতকের ওজন মাপার যন্ত্র, রেশম ওজনের দাঁড়িপাল্লা, বিভিন্ন আকারের ইস্পাতের দাঁড়িপাল্লা, ভারী ও বড় আকারের পণ্য ওজনের জন্য ব্যবহৃত বড় কাঁটা বা কপান, দাঁড়িপাল্লায় ব্যবহৃত বিভিন্ন ওজনের পাথর, সূচকযুক্ত দাঁড়িপাল্লা, তরল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য মাপার পাত্র, হাতে চালিত পেট্রোল পাম্প এবং মুদি, কাপড় ব্যবসা ও পশুখাদ্য ব্যবসার মতো পেশায় ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্র।

এই অংশে এসব বৈচিত্র্যময় ও আকর্ষণীয় পুরোনো পরিমাপক সামগ্রী দর্শনার্থীরা দেখতে পারেন।

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘরের পশ্চিম অংশ

জাদুঘরের পশ্চিম অংশটি আগে বসন্তকালে বাড়ির বাসিন্দাদের বিশ্রামের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে এখানে আবহাওয়াবিজ্ঞান ও ভূতত্ত্বের বিভিন্ন বিশেষায়িত পরিমাপক যন্ত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।

এই অংশে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের থার্মোমিটার, বৃষ্টিমাপক যন্ত্র, স্কেল ও জ্যামিতিক মাপের সরঞ্জাম, কম্পাস, অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপ পরিমাপক যন্ত্র, দিক নির্ণয়ের যন্ত্র এবং আরও কিছু বিশেষ পরিমাপক যন্ত্র যেমন তেল মাপার যন্ত্র, পানির পরিমাপক, গাড়ির ইঞ্জিনের গতি মাপার যন্ত্র, ভাঁজ করা মিটার এবং প্রথম দিকের ক্যালকুলেটরের একটি সংস্করণ।

জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন হলো ৪০ লাখ বছর পুরোনো একটি গাছের জীবাশ্ম, যা জাদুঘরের আঙিনায় রাখা আছে। কয়েক বছর আগে মোগান সমভূমি থেকে এই জীবাশ্মটি আবিষ্কার করা হয় এবং পরে জাদুঘরে আনা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই গাছটি সেনোজোয়িক যুগের শেষ পর্যায়ের প্লায়োসিন যুগে বেড়ে উঠেছিল এবং মাটির নিচে চাপা পড়ার পর ধীরে ধীরে সিলিকা পাথরে পরিণত হয়েছে।

 

তাবরিজ পরিমাপ জাদুঘর: মানুষের উদ্ভাবিত আকর্ষণীয় পরিমাপক যন্ত্রের এক অনন্য প্রদর্শনী
পূর্ব আজারবাইজান
তাবরিজ
Science and Technology

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: