এজেন্সি
গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর, উত্তর ইরানের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ি ও জীবনধারার মাঝে এক মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর, উত্তর ইরানের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ি ও জীবনধারার মাঝে এক মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর, উত্তর ইরানের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ি ও জীবনধারার মাঝে এক মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর

“গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর” ২৬৩ হেক্টর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত একটি কমপ্লেক্স। এই জাদুঘরটি সারাভান বন উদ্যানের একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর একটি ইকো-মিউজিয়াম, যার প্রধান উদ্দেশ্য হলো গিলানের স্থানীয় ও গ্রামীণ সমাজের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক আকর্ষণগুলো এমন এক পরিবেশে তুলে ধরা, যা গিলানের গ্রামীণ পরিবেশের সঙ্গে যতটা সম্ভব সামঞ্জস্যপূর্ণ।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরের ইতিহাস

১৯৯০ সালে (১৩৬৯ হিজরি শামসি) সংঘটিত ভূমিকম্পের পর, যার ফলে গিলান প্রদেশের কিছু গ্রাম ধ্বংস হয়ে যায়, তখন গিলানের গ্রামীণ বাড়িগুলোর অনুরূপ স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা উত্থাপিত হয়। এর মাধ্যমে শুধু ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য প্রদর্শনের সুযোগই তৈরি হয়নি, বরং প্রদেশের মানুষের জীবনধারা, ব্যবহৃত সরঞ্জাম ও উপকরণও প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয়।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর নির্মাণের প্রাথমিক গবেষণা ২০০২ সালে (১৩৮১ হিজরি শামসি) শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে (১৩৮৪ হিজরি শামসি) “পূর্ব সেফিদরুদ সমভূমির স্থাপত্য” বিষয়ক একটি কর্মশালা শুরু হওয়ার মাধ্যমে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠার প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

জাদুঘরের প্রথম পর্যায় ২০০৬ সালে চালু হয়। কিছু সময় পর জাদুঘর নির্মাণের গবেষণা দলের নজরে আসে সারাভান বন উদ্যান, কারণ এর বিশেষ ভূ-প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য ছিল। শেষ পর্যন্ত জাদুঘরের স্থান এই বন উদ্যানে স্থানান্তর করা হয়।

এরপর গিলান প্রদেশের গ্রামীণ স্থাপত্যের আদলে জাদুঘর তৈরির কাজ শুরু হয়। এ জন্য গবেষণা দলগুলো বিভিন্ন গ্রামে পাঠানো হয় এবং সেখানকার মূল্যবান স্থাপনাগুলো শনাক্ত করা হয়।

বর্তমানে গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরে যে ভবনগুলো দর্শনার্থীদের জন্য প্রদর্শিত হচ্ছে, সেগুলো বিভিন্ন গ্রাম থেকে নির্বাচন করে খুলে (স্থানান্তরের উপযোগী করে) পার্ক এলাকায় নিয়ে আসা হয় এবং পরে আগের কাঠামো ও রূপ অনুযায়ী পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

এই কঠিন ও নিখুঁত প্রকল্পটি ২০০৭ সালে (১৩৮৬ হিজরি শামসি) অনুষ্ঠিত ইরানের ২১তম খাওয়ারিজমি বৈজ্ঞানিক উৎসবে ৬১০টিরও বেশি প্রকল্পের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করে।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরের বিভাগ ও বৈশিষ্ট্য

সারাভান বন উদ্যানের মোট আয়তন ১,৪৮০ হেক্টর, যার মধ্যে ২৬৩ হেক্টর এলাকা গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরের জন্য নির্ধারিত হয়েছে। প্রতি বছর এই জাদুঘর ইরানের অন্যতম সর্বাধিক দর্শনার্থীপ্রাপ্ত জাদুঘরের তালিকায় স্থান পায়।

জাদুঘরের বিভিন্ন বিভাগে গিলান প্রদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের আবাসিক ভবনের অনুকরণে গ্রামীণ বাড়িগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। গ্রামীণ বাড়িগুলোকে যতটা সম্ভব কম পরিবর্তন করে স্থানান্তর ও পুনঃস্থাপন করাই এই জাদুঘরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এর ফলে দর্শনার্থীরা গিলান প্রদেশের গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে খুব কাছ থেকে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পান।

এছাড়াও এই জাদুঘরে গিলান প্রদেশের মানুষের বিশাল জ্ঞানভিত্তিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। জাদুঘরে পুনর্নির্মিত কিছু বাড়ির বয়স ১৫০ বছরেরও বেশি।

গিলান প্রদেশের গ্রামবাসীদের সাংস্কৃতিক উপাদান ও জীবনযাত্রার বৈশিষ্ট্যগুলোও এই জাদুঘরে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই বাড়িগুলোর বিভিন্ন স্থানে রান্নার সরঞ্জাম, পোশাক তৈরির উপকরণ এবং দৈনন্দিন কাজের ব্যবহৃত জিনিসপত্র প্রদর্শন করা হয়েছে।

এছাড়াও গিলান প্রদেশের হস্তশিল্প সামগ্রী বিক্রির জন্য একটি ছোট বাজারও তৈরি করা হয়েছে।

সামগ্রিকভাবে জাদুঘরটি ৯টি বিভাগে বিভক্ত, যেগুলো হলো:

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরের বিভাগসমূহ

১. পূর্ব সমভূমি (جلگه شرق)

এই বিভাগে পূর্ব সেপিদরুদ (سپیدرود) সমভূমি অঞ্চলে নির্মিত চেনচু, মিরসিয়ার, মোনতাজেরি ও রাফেয়ি পরিবারের বাড়ির অনুকরণে তৈরি স্থাপনা প্রদর্শিত হয়েছে।

এই অঞ্চলের গিলানি স্থাপত্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো কাঠের কাঠামো, কাঠের ভিত্তি (কারসি) এবং চার ঢালবিশিষ্ট গালিপোশ (খড়/পাতার তৈরি) ছাদ।

এই বিভাগে সবজি ও শস্যের বাগান, কানদুজ (ধান রাখার গুদাম), গোয়ালঘর, তালমবার (রেশম পোকার চাষের স্থান), মসজিদ ও কফিখানার মতো স্থানও পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।

২. পশ্চিম সমভূমি (جلگه غرب)

গিলানের পশ্চিম সমভূমি শাফত থেকে আস্তারা পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে।

পশ্চিম গিলানের বাড়িগুলো সাধারণত ধানের কাণ্ড দিয়ে তৈরি ঢালু ছাদ এবং দেয়াল নির্মাণের বিশেষ পদ্ধতিতে তৈরি করা হয়। এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা হলো পশুপালন এবং ধান ও চা চাষ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ। এই বিষয়গুলো ভবনের কাঠামোতেও বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।

এই বিভাগে মুসিজাদে, হাকিকতি, মাহমুদি, মুসাভি, হাসানি ও মোহতাশেমতালাব পরিবারের বাড়িগুলো প্রদর্শিত হয়েছে।

ধানের গুদাম, গোয়ালঘর, মুরগি ও পাখি রাখার ঘর, পানির কূপ এবং শৌচাগারও এই বিভাগের সহায়ক স্থাপনার অংশ।

 

৩. মধ্য সমভূমি

এই বিভাগে আমিনি, মোরাদি, বিয়ালভা, দানেশ ও সাদেকি পরিবারের বাড়ির পাশাপাশি ধানের গুদাম, তালমবার, গোয়ালঘর, মুরগির ঘর, বিদ্যালয়, কফিখানা, কামারের কর্মশালা এবং ধানক্ষেত দেখা যায়।

গিলানের এই অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ভবনের ছাদে খড় ও ধানের কাণ্ড ব্যবহার করা হয়। কিছু বাড়িতে গাছের ডাল ও কাণ্ডের পাশাপাশি খড়-মাটির মিশ্রণও ব্যবহার করা হয়েছে। এসব নির্মাণ উপকরণের কারণে এই বাড়িগুলোকে “জেগালি” বা “জেগমেই” বলা হয়।

 

৪. পূর্ব পাহাড়ি অঞ্চল

গিলান প্রদেশের এই অংশে বাড়িগুলো পাথরের দেয়াল ও জেগমেই পদ্ধতিতে নির্মিত হয়।

এই বিভাগের উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো মোহাম্মদনেজাদ ও মোহসেনিয়ান পরিবারের বাড়ি। এই অঞ্চলের মানুষের প্রধান পেশা হলো পশুপালন।

 

৫. পশ্চিম পাহাড়ি অঞ্চল

এই বিভাগে হোজ্জাতপুর পরিবারের একটি বাড়ি রয়েছে। এর পাশে রুটি তৈরির চুলা ও মুরগি রাখার ঘরও দেখা যায়।

পশ্চিম গিলানের পাহাড়ি এলাকার বাড়িগুলো জেগমেই দেয়াল এবং ওজলতি ছাদ দিয়ে তৈরি হয়। ওজলতি হলো এক ধরনের শুকনো উদ্ভিদজাত ছাউনি।

৬. পূর্ব পাহাড়ের পাদদেশ

এই বিভাগে বেহজাদি, জামে ও রোস্তমি পরিবারের বাড়ি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। পূর্ব পাহাড়ের পাদদেশের বাড়িগুলো পূর্ব সেফিদরুদ সমভূমির বাড়ির মতোই নির্মিত।

৭. পশ্চিম পাহাড়ের পাদদেশ

এই অংশে রহমানি, তারাফি ও লোতফি পরিবারের বাড়ি রয়েছে। এগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো কাঠের কাঠামো, পাথরের ভিত্তি এবং ঢালু ছাদ।

৮. পূর্ব উপকূল

এই বিভাগে শুধু একটি বাড়ি রয়েছে মুসাভি পরিবারের বাড়ি। এই অঞ্চলের বাড়ির স্থাপত্য পূর্ব সেফিদরুদ সমভূমির বাড়ির মতো।

৯. পশ্চিম উপকূল  

এই বিভাগেও শুধুমাত্র একটি বাড়ি রয়েছে, যা আসেফি পরিবারের বাড়ি।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরের নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘরে কয়েকটি স্থানীয় খেলা ও লোকজ প্রদর্শনীর পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘আরুস গুলি’ (عروس گولی), ‘গিলেমর্দ কুস্তি’ (کشتی گیلهمرد) এবং ‘লাফান্দবাজি’ (لافندبازی)।

আরুস গুলি (বর-কনে নাট্য প্রদর্শনী) হলো একটি নওরোজ (ইরানি নববর্ষ) উপলক্ষে অনুষ্ঠিত লোকনাট্য, যা গ্রামগুলোতে এসফান্দ মাসের দ্বিতীয়ার্ধ (মার্চের শুরু) থেকে পরিবেশিত হয়।

গিলেমর্দি কুস্তি হলো একটি প্রাচীন কুস্তি প্রতিযোগিতা, যা নওরোজ ও বিয়ের অনুষ্ঠানে অনুষ্ঠিত হতো। এছাড়াও খোরদাদ মাস থেকে শুরু করে শাহরিভার মাসের শেষ পর্যন্ত (প্রায় জুন থেকে সেপ্টেম্বর) কিছু গ্রামেও এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। এতে যে প্রতিযোগী মাটিতে পড়ে যায় অথবা কোনোভাবে তার হাত মাটির সঙ্গে স্পর্শ করে, তাকে পরাজিত ঘোষণা করা হয়।

লাফান্দবাজি হলো এক ধরনের প্রাচীন ও বিশেষ দড়ির খেলা, যেখানে বিভিন্ন কৌশল ও শিল্পকলার সমন্বয় করা হয়। সাধারণত গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়, শরতের শুরু এবং নওরোজ উপলক্ষে এই খেলার আয়োজন বেশি দেখা যায়।

 

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর দেখতে হলে সারাভান বন উদ্যানে যেতে হবে। এই উদ্যানটি সারাভান থেকে শাফত যাওয়ার সড়কের ১৮তম কিলোমিটারে অবস্থিত।

জাদুঘরটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বের কারণে ২০০৭ সালে (১৩৮৬ হিজরি শামসি) এটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

গিলান গ্রামীণ ঐতিহ্য জাদুঘর, উত্তর ইরানের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাড়ি ও জীবনধারার মাঝে এক মনোমুগ্ধকর ভ্রমণ।
গুইলান
রাশত

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: