হস্তশিল্প

ইরানের ঐতিহ্যবাহী তালা নির্মাণ, সরল অথচ রহস্যময়।

ইরানে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি তালাগুলো দেখতে সাধারণ মনে হলেও, এগুলো তৈরিতে অত্যন্ত নিখুঁত ও রহস্যময় কিছু কৌশল ব্যবহার করা হয়।

মানবজাতির অস্তিত্বের শুরু থেকে মূল্যবান ও দামি জিনিসপত্র সংরক্ষণের প্রয়োজন মানুষকে নানা উপায় চিন্তা করতে এবং সৃজনশীল হতে বাধ্য করেছে। এসব চিন্তাভাবনার ফলস্বরূপ এমন সব নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা উদ্ভাবিত হয়েছে, যা মূল্যবান জিনিসপত্রে প্রবেশাধিকার সীমিত করত। এ কারণে তালা তৈরির শিল্পের ইতিহাসকে অত্যন্ত প্রাচীন ও দীর্ঘ বলে মনে করা উচিত এবং এটিকে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক জীবনের মতোই প্রাচীন বলে বিবেচনা করা যায়।

ইরানে তালা তৈরির শিল্পের ইতিহাস

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, মানুষ যে প্রথম তালা তৈরি করেছিল, তা ছিল এমন কিছু গিঁট, যা খোলা সবার পক্ষে সম্ভব ছিল না। ধীরে ধীরে আরও উন্নত তালা তৈরির জন্য কাঠ ব্যবহার করা শুরু হয়। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দে দক্ষিণ-পশ্চিম এশিয়ায় কাঠের তালা তৈরি করা হতো। ইরানে তালা ব্যবহারের ইতিহাসও আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮০০ সালের বলে ধারণা করা হয়।

কাশানের তেপে সিয়াল্কে প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে একটি পাথরের বালা আবিষ্কৃত হয়েছে, যাতে চারটি পৃথক অংশ রয়েছে এবং একটি সংযোগকারী বন্ধনী সেগুলোকে একসঙ্গে যুক্ত করেছে। শুশের চোগা জেম্বিলেও একটি তালা পাওয়া গেছে, যা খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ সালের বলে ধারণা করা হয়।

পার্সেপোলিস জাদুঘরে সংরক্ষিত তৃতীয় আরদাশিরের সমাধির পাথরের দরজায় ছয় সেন্টিমিটার ব্যাসের একটি ছিদ্র দেখা যায়। ধারণা করা হয়, এটি সম্ভবত চাবি প্রবেশ করানো এবং ক্লোনের হাতল সরানোর জন্য ব্যবহৃত হতো।

ইরানে বড় দরজা বন্ধ করার জন্য ‘ক্লোন’ নামে একটি উপকরণ ব্যবহার করা হতো। তবে ছোট আকারের জিনিসপত্র, যেমন সিন্দুক ও ছোট বাক্সে ধাতু দিয়ে তৈরি স্থায়ী তালা লাগানো থাকত। ইরানে আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন স্থায়ী তালাটি সাসানীয় যুগের (খ্রিস্টীয় তৃতীয় থেকে সপ্তম শতাব্দী) বলে জানা যায়।

ইরানের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজে একটি ব্রোঞ্জের চাবিও আবিষ্কৃত হয়েছে, যা খ্রিস্টীয় প্রথম থেকে তৃতীয় শতাব্দীর মধ্যে তৈরি হয়েছিল। গ্রিক ও রোমান চাবির সঙ্গে এই চাবিটির সাদৃশ্য থেকে বোঝা যায় যে ইরান ও ইউরোপে তালা তৈরির কৌশলের বিকাশ প্রায় একই সময়ে ঘটেছিল।

ইরানে ইসলাম আগমনের কয়েক শতাব্দী পর নকশাযুক্ত বা চিত্রখচিত তালার প্রচলন শুরু হয়। এসব তালায় প্রায়ই বিভিন্ন প্রাণীর ছবি ব্যবহার করা হতো। সেলজুক যুগে (১০৩৭ থেকে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দ) এই ধরনের তালার ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে কিছু পরিবর্তনের ফলে ইরানের ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির শিল্প একটি ভিন্ন রূপ লাভ করে। এর মধ্যে প্রথমত, সাফাভি রাজবংশের উত্থান, যা শিল্পকলার উন্নতি ঘটায় এবং এর ফলে তালা তৈরির শিল্পও বিস্তৃত হয়। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় পর্যটকদের ইরানে আগমন এবং শিল্পী ও কারিগরদের ইউরোপীয় কৌশল ও শিল্পকলার সঙ্গে পরিচিত হওয়া। তৃতীয়ত, ইস্পাতের ব্যবহার শুরু হওয়া, যা আরও বেশি নকশা ও নকশার বৈচিত্র্য তৈরি করার সুযোগ করে দেয়।

ঐতিহ্যবাহী তালার বৈশিষ্ট্য ও প্রকারভেদ

তালা নির্মাণের কারিগরদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সবসময় নতুন নতুন পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহার করতে হতো। এর ফলে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় তালা তৈরির কাজ একটি ক্রমবর্ধমান ও জটিল শিল্পে পরিণত হয় এবং অল্পসংখ্যক কারিগরই এই কাজের সমস্ত রহস্য ও কৌশল আয়ত্ত করতে সক্ষম হন। উদাহরণস্বরূপ, ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তৈরি কিছু তালা কেবল সেই চাবি দিয়েই খোলা যায়, যা তালা নির্মাতা নিজে নকশা করে তৈরি করেছেন। সেই নির্দিষ্ট চাবি ছাড়া তালাটি কার্যকর হয় না।

সাধারণভাবে ইরানে তৈরি ঐতিহ্যবাহী তালাগুলোকে দুটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ‘দরজার তালা’ এবং ‘লোহার তালা’। অবশ্য লোহার তালা তৈরিতে পিতল, ব্রোঞ্জ ও তামার মতো অন্যান্য ধাতুও ব্যবহার করা হয়। তবে এগুলো তৈরিতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ধাতু হলো ইস্পাত। লোহার তালাগুলো দরজার তালার তুলনায় বেশি বৈচিত্র্যময় ও জটিল। এসব তালা সাংকেতিক পদ্ধতিতে অথবা চাবির সাহায্যে খোলার উপযোগী করে তৈরি করা হয়। এছাড়া এগুলো তৈরির সময় সিংহ, গরু, ঘোড়া, হরিণ, বন্য শূকর ও পাহাড়ি ছাগলের মতো প্রাণীর আকৃতি অথবা পৌরাণিক জীবের আকৃতিও ব্যবহার করা হতে পারে।

বর্তমানেও ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরিতে চিমটা, শানপাথর/ফাইল, হাতুড়ি ও ড্রিলের মতো সাধারণ ও হাতচালিত সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়। ইরানের ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো কামারের কারখানায় পড়ে থাকা লোহার বর্জ্য ও অব্যবহৃত টুকরো ব্যবহার করা।

ইরানি ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে লোহার পাত ও তার প্রয়োজনীয় মাপ অনুযায়ী কেটে নেওয়া হয়। এগুলো দিয়েই তালার খোলস এবং ভেতরের বিভিন্ন অংশ তৈরি করা হয়। এরপর লোহার পাত বাঁকিয়ে তার জোড় সিল করে দেওয়া হয়। ভেতরের অংশগুলো ফাইল দিয়ে ঘষে মসৃণ ও উপযুক্ত আকার দেওয়া হয় এবং তালার ধরন অনুযায়ী সেগুলো খোলসের ভেতরে স্থাপন করা হয়।

ইরানের কোন কোন শহরে ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির প্রচলন রয়েছে?

আধুনিক যুগে শিল্পকারখানায় তৈরি তালার প্রচলন বৃদ্ধি পেলেও, ইরানে এখনও বিভিন্ন শহরে ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির কাজ মূলত শিল্পকর্ম ও অলংকারিক নিদর্শন হিসেবে চালু রয়েছে। এসব তালা তৈরিতে ব্যবহৃত নানা উদ্ভাবনী কৌশলের কারণে এগুলোর বিশেষ কিছু অনুরাগী রয়েছে এবং মূল্যবান জিনিসপত্র সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রে এগুলো এখনও কার্যকারিতা ধরে রেখেছে। বর্তমানে ইরানের আবেরকুহ (ইয়াজদ প্রদেশ), কাজভিন, হামেদান, বোরুজের্দ (লোরেস্তান), তালেকান (আলবোরজ প্রদেশ), সাভজবোলাঘ (আলবোরজ প্রদেশ) এবং নাজাফাবাদ (ইসফাহান প্রদেশ)-এর মতো শহরে ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরির এই কারুশিল্প ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়েছে। তবে ইরানের বহু প্রদেশ ও শহরে, যার মধ্যে চারমাহাল ও বখতিয়ারি প্রদেশও রয়েছে, এখনও কারিগররা ঐতিহ্যবাহী তালা তৈরি ও মেরামতের কাজে নিয়োজিত আছেন।

এই শিল্পের কারিগরদের মধ্যে কাজভিনে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে তালা তৈরির কাজে নিয়োজিত হাসান কুকবি-র নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর নাম ইরানের অমূর্ত ঐতিহ্যের তালিকায় ‘জীবন্ত মানব ঐতিহ্য’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।