ইরানের পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশ দেশটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রদেশ। ইরানের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি ও পরিবর্তনের ধারায় এই প্রদেশ সব সময়ই বিশেষ ও কার্যকর ভূমিকা পালন করে এসেছে। শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রদেশের অন্যতম পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়। এটি আজারশাহর শহরের কাছে এবং তাবরিজ থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।
শহীদ মাদানি কে ছিলেন?
মির আসাদুল্লাহ মাদানি ছিলেন একজন ধর্মীয় নেতা ও ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের পণ্ডিত। তিনি ১৯১৪ সালে আজারশাহর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইয়াজদ, কোম ও নাজাফে ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন এবং ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ে পরিণত হওয়া আন্দোলনগুলোতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
অবশেষে, ১৯৮১ সালে জুমার নামাজ পরিচালনার সময় তিনি আততায়ীর হামলায় নিহত হন। এই ধর্মীয় পণ্ডিত ও রাজনৈতিক কর্মীর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাঁর নামে শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়। এটি তাঁর অবদানকে স্মরণ ও সম্মান জানানোর একটি নিদর্শন।
শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৮৯ সালে । প্রাথমিকভাবে এই উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল ‘তাবরিজ শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়’। টানা ১৩ বছর ধরে এটি পশ্চিম ইরানে শিক্ষকদের বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হতো। ২০০১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির কাঠামো পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের আদলে পুনর্গঠন করা হয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে ‘আজারবাইজান শিক্ষক প্রশিক্ষণ বিশ্ববিদ্যালয়’ রাখা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বশেষ নাম পরিবর্তন করা হয় ২০১২ সালে । সে সময় শহীদ আয়াতুল্লাহ মাদানির বৈজ্ঞানিক ও সামাজিক মর্যাদার প্রতি সম্মান জানিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম তাঁর নামানুসারে রাখা হয়।
শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ও গবেষণামূলক কার্যক্রম
শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি ক্যাম্পাস রয়েছে। এর মধ্যে ১,২০০ হেক্টর আয়তনের মূল ক্যাম্পাসটি আজারশাহর শহরের কাছে অবস্থিত। তাবরিজ শহরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর ক্যাম্পাসটি মূলত স্নাতকোত্তর শিক্ষা, গবেষণা ও প্রযুক্তির ওপর গুরুত্ব দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করে। এই ক্যাম্পাসে গবেষণা পরিচালনা এবং শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ধারণা বিকাশের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২৮০ জনেরও বেশি শিক্ষক ও গবেষক এবং প্রায় ৭,৫০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। সাতটি অনুষদের অধীনে ১২১টি বিষয় ও বিশেষায়িত শাখায় স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল এই তিনটি পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন করছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাতটি অনুষদ হলো:
১. মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদ
২. কারিগরি ও প্রকৌশল অনুষদ
৩. তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটার প্রকৌশল অনুষদ
৪. কৃষি অনুষদ
৫. সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ
৬. শিক্ষাবিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান অনুষদ
৭. ধর্মতত্ত্ব অনুষদ
সামগ্রিকভাবে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২টি শিক্ষাবিষয়ক গ্রুপ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সাল পর্যন্ত এখান থেকে ২৫ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের জন্য রয়েছে দুটি গবেষণা ইনস্টিটিউট ‘বিদ্যুৎ শক্তি ব্যবস্থার প্রয়োগমূলক গবেষণা’ এবং ‘মনোসামাজিক স্বাস্থ্য’। এ ছাড়া ‘আণবিক সিমুলেশন’ ও ‘সহনশীল স্মার্ট গ্রিড’ নামে দুটি গবেষণাগারও রয়েছে।
শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও কার্যক্রম
২০২৩ সালে প্রকাশিত টাইমস হায়ার এডুকেশন প্রতিষ্ঠানের র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, শহীদ মাদানি বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১৭৪তম এবং ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ২৩তম স্থান অর্জন করে।
এই র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির সর্বোচ্চ স্কোর ছিল গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি এবং গবেষণামূলক কার্যক্রমের ক্ষেত্রে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণার আন্তর্জাতিক মান ও প্রভাবের পরিচায়ক। কয়েক দশকের কার্যক্রমে বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষকেরা বিশ্বের বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক সাময়িকীতে ১০ হাজারেরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টি বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক সহযোগিতা করে আসছে। উল্লেখযোগ্য যৌথ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে:
- জাপানের কানাজাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সহযোগিতা: পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর ওপর ভূমিকম্পের প্রভাব নিয়ে গবেষণা।
- ইতালির বারি আলদো মোরো বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণা: আরাসবারান অঞ্চলের পরিবেশগত বৈচিত্র্য নিয়ে অনুসন্ধান ও গবেষণা।
এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি বছর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। এ ছাড়া এখানে ‘বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দপ্তর’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এই দপ্তর বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর, আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান ও কার্যক্রম সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করে।