ইরানের অন্যতম পার্বত্য প্রদেশ হলো লোরেস্তান, যার সীমানার মধ্যে জলবায়ুর বৈচিত্র্য স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। ‘লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়’ এই প্রদেশের বৃহত্তম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায় ৯ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ক্যাম্পাসটি প্রদেশের রাজধানী খোররামাবাদ শহরে অবস্থিত। এ ছাড়া, প্রদেশের বিভিন্ন শহরে আরও চারটি কেন্দ্র এর অধীনস্থ শাখা কেন্দ্র হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
যদিও লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে নিজস্ব কার্যক্রম শুরু করে, তবে এর গঠনপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে । সে সময় ‘লোরেস্তান উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র’ আহভাজের জুন্দিশাপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ একটি কেন্দ্র হিসেবে ১০০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কার্যক্রম শুরু করে।
এই উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রের প্রথম শিক্ষার্থীরা স্নাতক পর্যায়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, গণিত ও জীববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে।
ইসলামি বিপ্লবের (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) বিজয়ের পর এই কেন্দ্রটি স্বাধীনভাবে ‘লোরেস্তান উচ্চশিক্ষা কমপ্লেক্স’ নামে কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকে। পরবর্তী বছরগুলোতে লোরেস্তান প্রদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা উত্থাপন করা হয়। অবশেষে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এই কমপ্লেক্সটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদায় উন্নীত করার মাধ্যমে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়।
লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত ও গবেষণাগত অবস্থা
বর্তমানে লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে আটটি অনুষদ রয়েছে:
১. প্রাকৃতিক সম্পদ অনুষদ: এই অনুষদে তিনটি বিভাগ রয়েছে ‘বনবিদ্যা’, ‘চারণভূমি প্রকৌশল ও অববাহিকা ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘মৎস্যবিজ্ঞান ও প্রকৌশল এবং পরিবেশবিজ্ঞান’।
২. সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ: এই অনুষদে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এখানে ৮০ জন পূর্ণকালীন শিক্ষক ১২টি শিক্ষাবিভাগের অধীনে কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
৩. কৃষি অনুষদ: এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হওয়ার এক বছর পর কৃষি অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই অনুষদে কৃষিবিষয়ক পাঠ্যক্রম পরিচালনা এবং গবেষণার দিকনির্দেশনা দেওয়ার জন্য ১০টি শিক্ষাবিভাগ গঠন করা হয়েছে।
৪. মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদ: এই অনুষদে স্নাতক পর্যায়ে ১১টি বিষয় ও বিশেষায়ন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২৪টি বিষয় ও বিশেষায়ন এবং ডক্টরাল (পিএইচডি) পর্যায়ে ১৬টি বিষয় ও বিশেষায়নে পাঠদান করা হয়। মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদে ৭৮ জন শিক্ষক রয়েছেন।
৫. প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদ: ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এই অনুষদে আটটি শিক্ষাবিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
৬. ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি অনুষদ: ‘ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘ব্যবসায় অর্থনীতি’ ছিল এই অনুষদের প্রথম দুটি বিভাগ। বর্তমানে এই দুটি বিভাগের সঙ্গে হিসাববিজ্ঞান বিভাগও যুক্ত হয়েছে। ১৫ জন পূর্ণকালীন শিক্ষকের অংশগ্রহণে লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে পশ্চিম ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
৭. পশুচিকিৎসা অনুষদ: লোরেস্তান প্রদেশে পশুপালন-সম্পর্কিত কার্যক্রমের প্রসারের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে এই অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে পশুচিকিৎসা অনুষদে আটটি শিক্ষাবিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
৮. রসায়ন অনুষদ: এই অনুষদের ইতিহাস ১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে ফিরে যায়। সে সময় এটি লোরেস্তান উচ্চশিক্ষা কেন্দ্রের চারটি শিক্ষাবিভাগের একটি হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। তবে মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদ থেকে রসায়ন বিভাগকে পৃথক করে স্বতন্ত্র রসায়ন অনুষদ প্রতিষ্ঠা করা হয় ২০২২ সালে। বর্তমানে এই অনুষদে ১৯ জন পূর্ণকালীন শিক্ষক রয়েছেন।
এ ছাড়া, লোরেস্তান প্রদেশের বিভিন্ন শহরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ শাখা কেন্দ্র হিসেবে আরও চারটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে:
- কুহদাশত: এই কেন্দ্রে ‘গণিত ও এর প্রয়োগ’ বিষয়ে পাঠদান করা হয়।
- আলিশতার: এই কেন্দ্রটি ছাত্রীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত। এখানে প্রায় ৫০০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তাদের জন্য ‘কম্পিউটার প্রকৌশল’, ‘গণিত ও এর প্রয়োগ’, ‘ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা’, ‘শিল্প ব্যবস্থাপনা’ এবং ‘ভূগোল’ বিষয়ে পড়াশোনার ব্যবস্থা রয়েছে।
- পোলদোখতার: এই কেন্দ্রটি ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে কার্যক্রম শুরু করে। প্রাথমিকভাবে এখানে ‘সফটওয়্যার বিশেষায়নে কম্পিউটার প্রকৌশল’ এবং কৃষি প্রকৌশলের দুটি বিশেষায়ন ‘উদ্ভিদ রোগবিদ্যা’ ও ‘উদ্যানতত্ত্ব’ বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। বর্তমানে এই কেন্দ্রের বিষয়গুলোর তালিকায় কৃষি প্রকৌশল, মনোবিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, ইংরেজি ভাষা শিক্ষা এবং ক্রীড়াবিজ্ঞানও যুক্ত হয়েছে।
- নূরাবাদ: এই কেন্দ্রটি ছেলেদের জন্য নির্ধারিত। এখানে প্রায় ২২০ জন শিক্ষার্থীকে তিনটি বিষয়ে মনোবিজ্ঞান, জনপ্রশাসন এবং হিসাববিজ্ঞান শিক্ষা প্রদান করা হয়।
লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম
২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষাগত ও আবাসন-সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করে আরও বেশি বিদেশি শিক্ষার্থীর অধ্যয়নের সুযোগ সৃষ্টি করার পরিকল্পনা করছে। বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম-সংক্রান্ত বিষয়গুলো পরিচালনার জন্য ‘বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা দপ্তর’ নামে একটি দপ্তর কাজ করছে।
বিদেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণের পাশাপাশি, এই দপ্তরটি বিভিন্ন সভা ও সম্মেলনের আয়োজন করে এবং বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও অধ্যাপকদের লোরেস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ে আমন্ত্রণ জানানোর উদ্যোগও গ্রহণ করে।