সিস্তান ভূমি ইরানের পৌরাণিক বীরদের আবাসভূমি হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চল আজ বহু বছরের খরার কারণে নানা দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। তবুও এটি তার প্রাণবন্ততা ও ঐতিহাসিক স্বাতন্ত্র্য ধরে রেখেছে এবং আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলেছে। এই অঞ্চলে গতিশীল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি সেই উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশাবাদ জাগায়।
সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাবল বিশ্ববিদ্যালয় জাবল শহরে অবস্থিত। প্রায় ১৫ হাজার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের দক্ষ ও বিশেষজ্ঞ জনশক্তি গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ধীরে ধীরে জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আটটি অনুষদ গড়ে ওঠে:
- কৃষি: কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারিত হওয়ার পর ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে এটি অনুষদে উন্নীত হয়। উদ্ভিদ উৎপাদন১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দ, এবং প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দ, এই দুটি শিক্ষা বিভাগকে অনুষদটির প্রথম দিকের শিক্ষাবিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বর্তমানে এই অনুষদে ৮টি শিক্ষা বিভাগে ৬৫ জন শিক্ষক স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট—এই তিন স্তরে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
- বিজ্ঞান: ২০০১ খ্রিস্টাব্দে জীববিজ্ঞান (প্রাণিবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা ও সাধারণ জীববিজ্ঞান এই তিন শাখা) এবং গণিতের সমন্বয়ের মাধ্যমে বিজ্ঞান অনুষদ গঠিত হয়। পরবর্তীতে রসায়ন বিষয়ের বিশুদ্ধ ও প্রয়োগিক দুটি শাখাও এই অনুষদের অন্তর্ভুক্ত হয়। বর্তমানে এসব বিষয়ের পাশাপাশি পরিসংখ্যান ও পদার্থবিজ্ঞানও বিজ্ঞান অনুষদে পড়ানো হয় এবং অনুষদটির শিক্ষকসমিতিতে ৬৬ জন অধ্যাপক সদস্য রয়েছেন।
- ভেটেরিনারি মেডিসিন: এই অনুষদে মৌলিক বিজ্ঞান, প্যাথোবায়োলজি, খাদ্যদ্রব্যের স্বাস্থ্যবিজ্ঞান এবং ক্লিনিক্যাল সায়েন্স এই চারটি বিভাগ সক্রিয় রয়েছে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য ১০টি গবেষণাগারের পাশাপাশি একটি বিশেষায়িত ভেটেরিনারি পলিক্লিনিকও রয়েছে।
- প্রাকৃতিক সম্পদ: এই অনুষদটি ২০০০ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এখানে ৩টি শিক্ষা বিভাগ এবং ২৩ জন শিক্ষক কার্যরত রয়েছেন।
- শিল্পকলা ও স্থাপত্য: প্রাচীনত্বের দিক থেকে এই অনুষদটি বিজ্ঞান অনুষদের সমসাময়িক। প্রত্নতত্ত্ব ও স্থাপত্য ছিল এই অনুষদের প্রথম বিষয়, যেখানে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে অনুষদটি কেবল সহযোগী ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষার্থী গ্রহণ করত; বর্তমানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়েও শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
- প্রযুক্তি ও প্রকৌশল: জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন অনুষদগুলোর অন্যতম হলো প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদ, যেখানে ২০০১ সালের শীতকালীন সেমিস্টার থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি শুরু হয়। বর্তমানে এই অনুষদে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার এবং সার্ভেয়িং এই পাঁচটি বিভাগ কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং ৫০ জনেরও বেশি শিক্ষক শিক্ষকসমিতির সদস্য হিসেবে রয়েছেন।
- সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান: আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগকে জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের প্রাথমিক বছরগুলোতে ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিষয় যুক্ত হওয়ার ফলে পরবর্তীতে সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এই অনুষদের বিভাগের সংখ্যা বেড়ে ৯টিতে দাঁড়িয়েছে এবং ৬১ জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রমে নিয়োজিত রয়েছেন।
- পানি ও মৃত্তিকা: এই অনুষদটি ২০১০ সালে কার্যক্রম শুরু করে। বর্তমানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও ডক্টরেট এই তিন পর্যায়ে ৫০০ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করছে।
জাবল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও গবেষণামূলক কার্যক্রম
জাবল বিশ্ববিদ্যালয় তার গবেষকদের গবেষণাকর্মে সহায়তা এবং সৃজনশীল ধারণাগুলোকে সমর্থন করার লক্ষ্যে প্রযুক্তিনির্ভর ইউনিট বিকাশ কেন্দ্র নামে একটি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এই কেন্দ্রে উদ্যোক্তা এবং বাণিজ্যিকীকরণের সম্ভাবনাসম্পন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সঙ্গে যুক্ত করা হয়, যাতে পারস্পরিক সহযোগিতা ও যৌথ উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তি উন্নয়ন কেন্দ্র নামে আরও একটি কেন্দ্র চালু রয়েছে। এই কেন্দ্রে উদ্ভাবনী ধারণাগুলো এমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছে উপস্থাপন করা হয়, যারা নিজেদের কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণ করতে আগ্রহী। উদ্ভাবনের সংস্কৃতি প্রসার, বিশেষজ্ঞদের শনাক্তকরণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জ্ঞানভিত্তিক প্রযুক্তিতে ধারণা উদ্ভাবনকারী ও গবেষকদের ভূমিকা শক্তিশালী করা—এই কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
গবেষণামূলক কার্যক্রমের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ৯টি জার্নাল প্রকাশনা, যার মধ্যে ৫টি ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত হয়। এসব জার্নালে অণুজীববিজ্ঞান, সিস্তান ও বালুচিস্তানবিষয়ক গবেষণা, পানি প্রকৌশল, ফলিত বিজ্ঞান, কৃষি, পরিবেশ, শস্যবিজ্ঞান এবং নগর উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা প্রকাশিত হয়।