প্রতিটি সমাজে এমন কিছু মহান মানুষ আবির্ভূত হন, যাঁদের প্রচেষ্টা ও কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ এমন এক উত্তরাধিকার সৃষ্টি হয়, যা পরবর্তী প্রজন্মের মানুষ কাজে লাগিয়ে উন্নতি ও বিকাশের পথে এগিয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার আলীরেজা আফজালিপুর তেমনই একজন মহান মানুষ। তিনি যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, সেটিই আজ শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়, কেরমান নামে পরিচিত। এর মাধ্যমে তিনি কেরমান প্রদেশের উন্নতি ও অগ্রগতির লক্ষ্যে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন।
আফজালিপুর কে ছিলেন?
আলীরেজা আফজালিপুর ১৯০৯ সালের ২৬ মার্চ তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। ২২ বছর বয়সে তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য ফ্রান্সে যান এবং বোর্দো শহরে রসায়নে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর তিনি লিল শহরে কৃষি রসায়নের ওপর দুই বছরের বিশেষায়িত কোর্স সম্পন্ন করেন এবং ১৯৩৭ সালে ইরানে ফিরে আসেন।
ইরানে ফিরে আসার পর আফজালিপুর ইরান সরকারের চাকরিতে যোগ দেন। তবে পরবর্তীতে সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে বিদ্যুৎ-সংশ্লিষ্ট পণ্যের ব্যবসায় যুক্ত হন। এই ব্যবসা থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেন।
১৯৭০ সালে, যখন আফজালিপুর তাঁর জীবনের সপ্তম দশকে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি তাঁর স্ত্রী ফাখেরেহ সাবা-র সঙ্গে ইরানের অপেক্ষাকৃত কম উন্নত কোনো অঞ্চলে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা ভাবেন। এর এক বছর পর, আফজালিপুর কেরমানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।
২০০৩ সাল থেকে আলীরেজা আফজালিপুরের সম্মানে একটি পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়েছে। প্রতি বছর এই পুরস্কার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নির্বাচিত একজন ব্যক্তি এবং ইরানের একজন শ্রেষ্ঠ গবেষককে প্রদান করা হয়।
পরবর্তী বছরগুলোতে আলীরেজা আফজালিপুরের স্ত্রী ফাখেরেহ সাবা এবং তাঁর ভাই আলী আফজালিপুর-এর স্মরণেও আরও দুটি পুরস্কার প্রবর্তন করা হয়। ফাখেরেহ সাবা পুরস্কার শিল্পীদের এবং আলী আফজালিপুর পুরস্কার পরিসংখ্যান ও রসায়ন বিভাগের নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের প্রদান করা হয়।
এছাড়াও এসব পুরস্কারের পাশাপাশি শ্রেষ্ঠ উদ্যোক্তা নামে একটি পুরস্কারও চালু করা হয়েছে, যা ইরানের নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের প্রদান করা হয়।
সময়ের পরিক্রমায় কেরমানের শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়
শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়, কেরমান প্রতিষ্ঠার পর এর প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রস্তুতি এবং অবকাঠামোগত নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে কয়েক বছর সময় লাগে। ফলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম শিক্ষার্থীরা ১৯৭৫ সালে এখানে পড়াশোনা শুরু করেন। সে বছর ইংরেজি ভাষা, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, বিদ্যুৎ ও ইলেকট্রনিক্স এই পাঁচটি বিষয়ে মোট ৯০ জন শিক্ষার্থীকে তিনটি অনুষদের অধীনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করা হয়। অনুষদ তিনটি ছিল সাহিত্য, মৌলিক বিজ্ঞান এবং কারিগরি ও প্রকৌশল।
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে এবং এর শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ হাজারে পৌঁছেছে।
কেরমানের শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও শিক্ষাব্যবস্থা
বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১টি অনুষদ রয়েছে:
- কারিগরি ও প্রকৌশল অনুষদ
- সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ
- কৃষি অনুষদ
- গণিত ও কম্পিউটার অনুষদ
- মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদ
- আইন ও ধর্মতত্ত্ব অনুষদ
- পশুচিকিৎসা অনুষদ
- ব্যবস্থাপনা ও অর্থনীতি অনুষদ
- পদার্থবিজ্ঞান অনুষদ
- শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান অনুষদ
- শিল্পকলা ও স্থাপত্য অনুষদ
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়টির অধীনে বাফত শহরে একটি উচ্চশিক্ষা কমপ্লেক্স, দুটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র বাদসিরে কৃষি এবং রাভারে কার্পেটবিষয়ক শিক্ষা কেন্দ্র একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, পাঁচটি গবেষণা ইনস্টিটিউট, একটি গবেষণা কেন্দ্র এবং ৬৪টি শিক্ষা বিভাগ সক্রিয় রয়েছে।
মানবিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ৬৭টি বিষয় ও শাখা, মৌলিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে ৮৬টি বিষয় ও শাখা, কারিগরি ও প্রকৌশল ক্ষেত্রে ৬২টি বিষয়, কৃষিবিজ্ঞানে ৪৫টি বিষয় ও শাখা, শিল্পকলায় ৯টি বিষয় ও শাখা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ৩৪টি বিষয় ও শাখা পড়ানো হয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬০০ জনেরও বেশি স্থায়ী শিক্ষক ও গবেষক কর্মরত রয়েছেন এবং এ পর্যন্ত ৮২ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী এখান থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
কেরমানের শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও কার্যক্রম
শিক্ষার মানের কারণে কেরমানের শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে উল্লেখযোগ্য অবস্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৩ সালের সাংহাই র্যাঙ্কিংয়ে প্রধান বিষয় প্রকৌশল এবং বিশেষায়িত বিষয় খনি প্রকৌশল-এ ৭৬ থেকে ১০০তম অবস্থানের মধ্যে স্থান পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের তৃতীয় সেরা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কেরমান প্রদেশে বিভিন্ন খনি থাকার কারণে খনিজ সম্পদের অনুসন্ধান ও উত্তোলনসংক্রান্ত কার্যক্রমে বৈজ্ঞানিক ও গবেষণাগত সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে এই অবস্থানটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এছাড়াও, ২০২১ সালে প্রকাশিত ISC র্যাঙ্কিংয়ে কেরমানের শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয় ৬০১ থেকে ৭০০তম অবস্থানের মধ্যে স্থান পেয়ে ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে নিজের অবস্থান তুলে ধরেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি কনস্যুলার বিষয়ক দপ্তর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে অ-ইরানি শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সেবা প্রদান করে। প্রতি বছর শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার আগে শহীদ বহেনার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আবেদন গ্রহণের জন্য একটি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চপর্যায়ের নীতিমালা ও পরিকল্পনায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করাকে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং অন্যান্য দেশের সঙ্গে বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক জ্ঞানবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি করার অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।