বিশ্ববিদ্যালয়

উরুমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, একটি অগ্রগামী ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়

উরুমিয়া বিশ্ববিদ্যালয়কে ইরানের অন্যতম অগ্রগামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি দেশটির পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এবং প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করতে আসে।

আধুনিক ইরানের ইতিহাসে উরুমিয়া  অন্যতম অগ্রগামী শহর হিসেবে পরিচিত। ইরানের প্রথম আধুনিক হাসপাতাল, আধুনিক পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত প্রথম চিকিৎসা শিক্ষা কেন্দ্র, দেশের প্রথম স্থানীয় টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এবং প্রথম স্থানীয় সংবাদপত্র উরুমিয়া তেই প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক পটভূমির কথা বিবেচনা করলে, উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ও যে ইরানের অন্যতম প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয় এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস

উরুমিয়ায় জন্মগ্রহণকারী একজন আমেরিকান চিকিৎসক জোসেফ ককরান উনিশ শতকের শেষের দিকে এমন একটি স্থানে একটি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ের শহর ক্যাম্পাসে পরিণত হয়। এই প্রতিষ্ঠানটি ওয়েস্টমিনস্টার নামে পরিচিত ছিল। এটি ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে কার্যক্রম শুরু করে উরুমিয়া র কৃষি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ৮৭ বছর আগে এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক ইরানের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৫৬ বছর আগে। ১৯০৫ খ্রিস্টাব্দে ড. ককরানের আকস্মিক মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২৭ বছর ধরে চলা এই কলেজ থেকে মোট ২৬ জন ইরানি চিকিৎসক স্নাতক হন।

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে  ফিরে যায়, যখন সেখানে একটি উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কার্যক্রমের শুরুতে এই কেন্দ্রের শিক্ষকসংখ্যা ছিল কম এবং প্রতি বছর প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থীকে «কৃষিবিজ্ঞান» বিষয়ে সহযোগী ডিগ্রি পর্যায়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি করা হতো। যেসব শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে চাইতেন, তারা উরুমিয়া  থেকে প্রায় ৭০০ কিলোমিটার দূরে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করাজ কৃষি অনুষদে গিয়ে স্নাতক পর্যায়ের পড়াশোনা করতে পারতেন।

এই কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার চার বছর পর তৎকালীন সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় এবং ফাউন্ডেশন ফর দ্য নেয়ার ইস্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এর ভিত্তিতে চার বছর মেয়াদি একটি শিক্ষাক্রমের পরিকল্পনা করা হয়। কৃষি অনুষদের পাশাপাশি ভেটেরিনারি মেডিসিন অনুষদও প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় বই ও সরঞ্জাম সংগ্রহের কাজ শুরু হয়। ধীরে ধীরে উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ে মৌলিক বিজ্ঞান, উদ্ভিদবিজ্ঞান, প্রাণিবিজ্ঞান, কৃষি প্রকৌশল এবং গ্রামীণ শিক্ষা এই পাঁচটি শিক্ষা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং প্রতি বছর শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যা ১৫০ জনে উন্নীত হয়।

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই ফাউন্ডেশনের সহযোগিতার ফলে উরুমিয়ার উপকণ্ঠের নাজলু এলাকায় ৪০০ হেক্টর আয়তনের একটি বিশাল খামারও প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে মূল ক্যাম্পাস থেকে ১৯ কিলোমিটার দূরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গড়ে ওঠে এবং সেখানে বিভিন্ন ভবন নির্মিত হয়। পরবর্তীতে কৃষি ও পশুপালন, ভেটেরিনারি মেডিসিন এবং বিজ্ঞান  এই তিনটি অনুষদই নাজলুতে স্থানান্তরিত হয়।

পরবর্তী বছরগুলোতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা অনুষদ ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এবং ১৯৮৫ খ্রিস্টাব্দে ১৩৬৪ সৌর হিজরিতে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে, সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রকৌশল অনুষদ ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত যুক্ত হয়।

বর্তমানে উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০টি অনুষদ রয়েছে, সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান, অর্থনীতি ও ব্যবস্থাপনা, ইলেকট্রিক্যাল, কম্পিউটার ও উন্নত প্রযুক্তি, ভেটেরিনারি মেডিসিন, বিজ্ঞান ও রসায়ন, ক্রীড়াবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও প্রকৌশল, কৃষি, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং স্থাপত্য, নগর পরিকল্পনা ও শিল্পকলা। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৫০০-এরও বেশি শিক্ষক ও গবেষক রয়েছেন এবং ১৭ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি এই তিনটি স্তরে পড়াশোনা করছেন।

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান ও আন্তর্জাতিক কার্যক্রম

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়কে ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৩ সালে প্রকাশিত সাংহাই র‍্যাঙ্কিংয়ে প্রকৌশল বিভাগের প্রধান শাখা মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এ বিশ্ববিদ্যালয়টি বিশ্বব্যাপী ৩০১–৪০০তম স্থানের মধ্যে রয়েছে। খাদ্যবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়েও বিশ্ববিদ্যালয়টি ২০১–৩০০তম স্থানের মধ্যে রয়েছে। ২০২৩ সালের টাইমস র‍্যাঙ্কিংয়ে উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয় ৫০১–৬০০তম স্থানের মধ্যে থেকে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে। এছাড়া ২০২১ সালে প্রকাশিত ISC র‍্যাঙ্কিংয়ে কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি ৪৫১–৫০০তম স্থানের মধ্যে স্থান পেয়েছে।

উরুমিয়া  বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক ও একাডেমিক অবস্থান অনেক বিদেশি শিক্ষার্থীকে এখানে পড়াশোনার জন্য আকৃষ্ট করেছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রায় ১,৮০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এর ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট আসনের ১০ শতাংশেরও বেশি দখল করেছে। ২০১২ খ্রিস্টাব্দে  আন্তর্জাতিক ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনা ও অবস্থানের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে। এই ক্যাম্পাসে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইঞ্জিনিয়ারিং, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ইলেকট্রিক্যাল-টেলিকমিউনিকেশন, ইলেকট্রিক্যাল-ইলেকট্রনিক্স এবং কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং এই পাঁচটি প্রকৌশল বিষয় পড়ানো হয়।

এছাড়াও, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈজ্ঞানিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ গবেষণা পরিচালনার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়।