পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশে অটোমোবাইল, খাদ্য, তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল, নির্মাণসামগ্রী, সেলুলোজ এবং ইস্পাত শিল্পসহ বিভিন্ন শিল্পখাত রয়েছে। এ কারণে এটি ইরানের অন্যতম প্রধান শিল্পাঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই এসব শিল্পের জন্য দক্ষ জনশক্তি সরবরাহের ক্ষেত্রে শিল্পভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপস্থিতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, যা প্রাদেশিক রাজধানী তাবরিজ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে, এসকু জেলাতে অবস্থিত। এটি পূর্ব আজারবাইজান প্রদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিল্প বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত হয়।
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির ইতিহাস ও কাঠামো
১৯৮৯ সালে এই অঞ্চলের প্রয়োজনীয় দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা এবং এখানকার শিল্পগুলোর গবেষণা ও উন্নয়নমূলক চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়। এর ধারাবাহিকতায় সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি-তে প্রথম শিক্ষার্থীদের ভর্তি করা হয় ১৯৯০ সালে। এরপর ধীরে ধীরে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষাব্যবস্থা ও একাডেমিক কাঠামো সম্প্রসারিত হতে থাকে।
বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১১টি অনুষদ কার্যক্রম পরিচালনা করছে:
১. তড়িৎ প্রকৌশল
২. বায়োমেডিকেল প্রকৌশল
৩. রাসায়নিক প্রকৌশল
৪. পদার্থ প্রকৌশল
৫. খনি প্রকৌশল
৬. পুরকৌশল
৭. যন্ত্রকৌশল
৮. পলিমার প্রকৌশল
৯. মৌলিক প্রকৌশল বিজ্ঞান
১০. ইলেকট্রনিক শিক্ষা
১১. তেল ও গ্যাস প্রকৌশল
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে সহকারী ডিগ্রি পর্যায়ে ২টি, স্নাতক পর্যায়ে ২১টি, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ৫৫টি এবং পিএইচডি পর্যায়ে ৬০টি বিষয়ে পড়ানো হয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৬,০০০ জন। বিশ্ববিদ্যালয়টি উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ায়, মোট শিক্ষার্থীর প্রায় অর্ধেক স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে অধ্যয়ন করছেন। সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধিভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি হলো ভারজেগান টেকনিক্যাল কলেজ। এখানে খনি উত্তোলন এবং খনিজ পদার্থ প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে সহকারী ডিগ্রি পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করা হয়।
এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টির ইলেকট্রনিক শিক্ষা কেন্দ্র স্নাতক পর্যায়ে রাসায়নিক প্রকৌশল, পদার্থ প্রকৌশল, বায়োমেডিকেল প্রকৌশল এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে রাসায়নিক প্রকৌশল, পদার্থ প্রকৌশল ও বায়োমেডিকেল প্রকৌশল বিষয়ে শিক্ষার্থী ভর্তি করে।
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির গবেষণা কার্যক্রম
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে শিক্ষার্থীদের গবেষণা ও বিভিন্ন উদ্ভাবনী ধারণাকে সহায়তা করার জন্য বেশ কয়েকটি গবেষণা ও সহায়তা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে:
১. ন্যানোস্ট্রাকচার্ড ম্যাটেরিয়ালস গবেষণা কেন্দ্র
২. রিঅ্যাক্টর ও ক্যাটালিস্ট গবেষণা কেন্দ্র
৩. পলিমারিক ম্যাটেরিয়ালস গবেষণা প্রতিষ্ঠান
৪. প্রযুক্তিভিত্তিক ইউনিটগুলোর ইনকিউবেশন সেন্টার
৫. যন্ত্রভিত্তিক বিশ্লেষণ গবেষণা ও সেবা কেন্দ্র
৬. ভূমিকম্প গবেষণা কেন্দ্র
৭. বিজ্ঞান ও ধর্মের অধ্যয়ন ও গবেষণা কেন্দ্র
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধিকাংশ বর্তমান গবেষণা কেন্দ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ এবং তাদের জন্য গবেষণা প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে স্বনির্ভরভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করে। ফলে এসব কেন্দ্রের জন্য সরকারি বাজেটের ওপর নির্ভর করতে হয় না। এসব কেন্দ্রে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রায় ৪০০টি গবেষণা প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে। তেলক্ষেত্র থেকে উত্তোলনের হার বৃদ্ধি, সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, বায়োটেকনোলজি-ভিত্তিক পণ্য ও উপাদান উৎপাদন এবং পানি পরিশোধন এসব গবেষণার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল।
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি স্টাইরিনিক পলিমারের একটি বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র (Scientific Hub) হিসেবে পরিচিত। এ কারণে এটি উত্তর-পশ্চিম ইরানে পলিমার প্রকৌশল ক্ষেত্রে সক্রিয় একমাত্র বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। পলিমার প্রকৌশলের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের গবেষকদের বৈজ্ঞানিক ও গবেষণামূলক সেবা প্রদান করে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনকিউবেশন সেন্টারে কয়েক ডজন জ্ঞানভিত্তিক কোম্পানি ও প্রযুক্তি-ভিত্তিক ইউনিট প্রতিষ্ঠিত ও কার্যরত থাকাও এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা। এই কেন্দ্রটি ধারণা থেকে পণ্য তৈরি এবং গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় মূল্যবান সহায়তা প্রদান করে।
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির আন্তর্জাতিক অবস্থান ও কার্যক্রম
সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি প্রথমবারের মতো ২০২২ সালে টাইমস (Times) বিশ্ববিদ্যালয় র্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্ত হয় এবং বিশ্বের তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১৯৩তম স্থান অর্জন করতে সক্ষম হয়। একই র্যাঙ্কিংয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রকৌশল ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিজ্ঞানে ৫০১–৬০০তম এবং বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ৬০১–৮০০তম অবস্থানে ছিল।
QS র্যাঙ্কিংয়েও সাহান্দ ইউনিভার্সিটি বিশ্বব্যাপী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ১৪৮১তম স্থান অর্জন করে। এই র্যাঙ্কিংয়ে এশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে এর অবস্থান ৪৮৭তম এবং ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে ৩২তম। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক র্যাঙ্কিংয়ে রসায়নে ৯৩৯তম, প্রকৌশলে ৭৮৭তম এবং পদার্থবিজ্ঞানে/ম্যাটেরিয়াল সায়েন্সে ৫৩৪তম স্থান অর্জন করে।
২০২২–২০২৩ শিক্ষাবর্ষে সাহান্দ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে ভর্তি হওয়া বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ জনে পৌঁছেছে। বিশ্ববিদ্যালয়টির কর্মকর্তাদের ঘোষণার ভিত্তিতে, অদূর ভবিষ্যতে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সক্ষমতা ৩০০ থেকে ৪০০ জনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়টি বিদেশি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ বৈজ্ঞানিক সভা আয়োজন এবং সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের মাধ্যমে তার গবেষণামূলক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছে।