গিলান প্রদেশ ইরানের উত্তরে কাস্পিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত। এই প্রদেশটি অনুকূল জলবায়ু, বিস্তীর্ণ বনভূমি এবং কৃষিকাজের জন্য উর্বর মাটির কারণে পরিচিত। এ কারণে কৃষি বিষয়ের ক্ষেত্রে এটি বরাবরই ইরানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। গিলান বিশ্ববিদ্যালয় এই প্রদেশের প্রধান উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে কৃষিক্ষেত্র এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শিল্পকারখানা ও কার্যক্রমের ক্ষেত্রে ইরানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত।
গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস ১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে ফিরে যায়। সে সময় ইরান ও পশ্চিম জার্মানির সরকারের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যেখানে একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হয়।
তখন প্রদেশটির দুটি পুরোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান রাশতের উচ্চতর বাণিজ্য বিদ্যালয় এবং লাহিজানের উচ্চতর ব্যবস্থাপনা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রায় ছয় বছর অতিক্রান্ত হয়েছিল। গিলান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দুই বছর পর, প্রদেশের উচ্চশিক্ষা কার্যক্রমকে আরও সুসংগঠিতভাবে পরিচালনা করার লক্ষ্যে উভয় উচ্চতর বিদ্যালয়কে গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একীভূত করা হয়।
ইসলামি বিপ্লবের (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) বিজয়ের পর গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম জার্মানির ওপর নির্ভরতা ছাড়াই পরিচালিত হতে থাকে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টিতে আটটি শিক্ষাবিষয়ক বিভাগ এবং ৫০০ জন শিক্ষার্থী ছিল। পরবর্তীকালে ইরানে উচ্চশিক্ষার প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে গিলান বিশ্ববিদ্যালয়েরও উন্নতি ও সম্প্রসারণ ঘটে। এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে পর্যায়ক্রমে ‘মৌলিক বিজ্ঞান’, ‘প্রকৌশল’, ‘কৃষিবিজ্ঞান’, ‘মানবিক বিজ্ঞান’ এবং ‘চিকিৎসাবিজ্ঞান’ অনুষদ যুক্ত হয়।
গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগত ও গবেষণাগত অবস্থা
বর্তমানে গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ে ১৩৭টি বিষয় ও বিশেষায়ন, স্নাতকোত্তর পর্যায়ে ২৫৩টি বিষয় ও বিশেষায়ন এবং ডক্টরাল (পিএইচডি) পর্যায়ে ১৫৪টি বিষয় ও বিশেষায়ন রয়েছে (সর্বমোট ৫৪৪টি বিষয় ও বিশেষায়ন)। এ ছাড়া, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষদের সংখ্যা বেড়ে ১০টিতে দাঁড়িয়েছে:
১. সাহিত্য ও মানবিক বিজ্ঞান অনুষদ
২. শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়াবিজ্ঞান অনুষদ
৩. পূর্ব গিলানের প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদ
৪. যন্ত্রকৌশল অনুষদ
৫. প্রাকৃতিক সম্পদ অনুষদ
৬. স্থাপত্য ও চারুকলা অনুষদ
৭. কৃষিবিজ্ঞান অনুষদ
৮. গাণিতিক বিজ্ঞান অনুষদ
৯. মৌলিক বিজ্ঞান অনুষদ
১০. প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অনুষদ
৬০০ জন পূর্ণকালীন শিক্ষক এবং ১৮ হাজার শিক্ষার্থী নিয়ে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি উত্তর ইরানের বৃহত্তম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
এ ছাড়াও, গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি গবেষণা ইনস্টিটিউট সক্রিয় রয়েছে:
গিলানবিদ্যা গবেষণা ইনস্টিটিউট: এই গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো গিলান প্রদেশের সংস্কৃতি ও জলবায়ু নিয়ে গবেষণা করা এবং এর সুযোগ-সুবিধাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো। টেকসই উন্নয়ন এবং একটি আদর্শ সমাজ গড়ে তোলাও এই গবেষণা ইনস্টিটিউটের অন্যান্য লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানটি ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়।
কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চল গবেষণা ইনস্টিটিউট: গিলান প্রদেশ বিশ্বের বৃহত্তম হ্রদের পাশে অবস্থিত। এই হ্রদের আয়তন প্রায় ৩ লাখ ৯০ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং পানির পরিমাণ প্রায় ৭৮ হাজার ঘনকিলোমিটার। এ কারণে এই হ্রদ নিয়ে গবেষণার গুরুত্ব অনেক বেড়ে গেছে। গিলানের অধিবাসী এবং কাস্পিয়ান সাগরের আশপাশের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের জীবন এই সাগরের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। এই জলভাগ সম্পর্কে যত ভালোভাবে জানা যাবে, ততই তাঁদের জীবনযাত্রার উন্নতি সাধন করা সম্ভব হবে।
গিলান প্রদেশে এই সাগরের সঙ্গে অবৈজ্ঞানিক ও অনিয়মতান্ত্রিক আচরণের ফলে সাগরটি ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। এ কারণে কাস্পিয়ান সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষের সঙ্গে সাগরের আরও উপযুক্ত ও কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে এই গবেষণা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই গবেষণা ইনস্টিটিউটে তিনটি পরীক্ষাগার রয়েছে— ‘নদী ও সাগর প্রকৌশল’, ‘সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান’ এবং ‘পানি ও বর্জ্যপানি’। এ ছাড়া, এর অধীনে তিনটি গবেষণা দল কাজ করে— ‘সামুদ্রিক বিজ্ঞান’, ‘সামুদ্রিক শিল্প’ এবং ‘পানি ও পরিবেশ’।
গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক কার্যক্রম ও অবস্থান
গিলান বিশ্ববিদ্যালয়ের কাস্পিয়ান সাগর উপকূলবর্তী দেশগুলোর সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ইউনিয়নের সদস্যদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয় বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার বিষয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে।
টাইমস, লেইডেন এবং সাংহাই এই তিনটি আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিং পদ্ধতি অনুযায়ী গিলান বিশ্ববিদ্যালয়কে ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৩ সালে প্রকাশিত সাংহাই র্যাঙ্কিংয়ে গিলান বিশ্ববিদ্যালয় যন্ত্রকৌশল বিষয়ে ৩০১ থেকে ৪০০-এর মধ্যে স্থান অর্জন করেছে। এ ছাড়া, ২০২১ সালে প্রকাশিত আইএসসি (ISC) র্যাঙ্কিংয়ে কৃষিবিজ্ঞান বিষয়ে ৫০১ থেকে ৬০০-এর মধ্যে স্থান অর্জন করে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি ইরানের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে।
এই বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতি বছর বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ২০২৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ৩০০ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, পরবর্তী বছরগুলোতে ইরানের বাইরের শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করার জন্য আরও বেশি সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।