জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং বড় শহরগুলোতে মানুষের বসবাসের চাপ বৃদ্ধির কারণে স্থপতিরা উঁচু ভবন নির্মাণের জন্য নতুন নতুন পরিকল্পনা তৈরি করতে বাধ্য হন। বর্তমানে এ ধরনের সুউচ্চ টাওয়ার আধুনিক শহরগুলোর অন্যতম প্রতীক হিসেবে পরিচিত।
এসব টাওয়ারের মালিক ও স্থপতিরা শুধু বাণিজ্যিক ব্যবহারের কথা বিবেচনা করেন না, বরং এমনভাবে ভবন নির্মাণের চেষ্টা করেন যাতে তা পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে।
ইরানে মিলাদ টাওয়ার দেশের সর্বোচ্চ টাওয়ারের মর্যাদা লাভ করেছে। এর বিশাল উচ্চতার কারণে তেহরানের অধিকাংশ স্থান থেকেই এই টাওয়ার দেখা যায় অবশ্য আকাশ পরিষ্কার ও বায়ুদূষণমুক্ত থাকলে।
মিলাদ টাওয়ারের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
বিশ্বের সর্বোচ্চ ভবনগুলোর তালিকায় মিলাদ টাওয়ার ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী ২৪তম স্থানে রয়েছে। এই টাওয়ারের উচ্চতা ৪৩৫ মিটার এবং এটি একটি যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ টাওয়ার হিসেবে নির্মিত। টেলিযোগাযোগ কাজে ব্যবহৃত বিশ্বের সর্বোচ্চ টাওয়ারগুলোর মধ্যে এটি ষষ্ঠ স্থানে রয়েছে। টাওয়ারটির মোট নির্মিত এলাকা প্রায় ১৩ হাজার বর্গমিটার।
বর্তমানে মিলাদ টাওয়ার তেহরান পৌরসভার দ্বিতীয় অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত এলাকায় অবস্থিত। এখানে পৌঁছানোর জন্য শেখ ফজলুল্লাহ, হেম্মত, হাকিম ও চামরান মহাসড়ক ব্যবহার করা যায়।
ধারণা করা হয়, ইরান বিপ্লবের (১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ) আগেই একটি সুউচ্চ যোগাযোগ টাওয়ার নির্মাণের ধারণা উত্থাপিত হয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের শেষভাগে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই পরিকল্পনা বাস্তব রূপ পেতে শুরু করে। ১৯৯৭ সালে (১৩৭৬ হিজরি শামসি) মিলাদ টাওয়ারের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।
টাওয়ার নির্মাণের স্থান নির্বাচন ও নকশা বাস্তবায়নের গবেষণা ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে শুরু হয়। দুই বছর পর তেহরানের ২১টি স্থান সম্ভাব্য নির্মাণস্থল হিসেবে নির্বাচন করা হয়। পরবর্তী মূল্যায়নের পর চারটি স্থান চূড়ান্ত করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত পশ্চিম তেহরানের কুয়ে নাসর (গিশা) পাহাড়ি এলাকা টাওয়ার নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান হিসেবে নির্বাচিত হয়।
এই স্থান নির্বাচনের ক্ষেত্রে টেলিযোগাযোগ, সড়ক নির্মাণ, স্থাপত্য, অর্থনীতি, আবহাওয়াবিজ্ঞান, নগর পরিকল্পনা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার বিশেষজ্ঞরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্থানটি নির্বাচনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে ছিল সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা, এমন উচ্চতা যা তেহরানের প্রায় সব স্থান থেকে টাওয়ারটি দৃশ্যমান করে, ভবিষ্যৎ উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা, অবকাঠামোগত সুবিধার নিকটবর্তী অবস্থান এবং যোগাযোগ ও টেলিযোগাযোগ সরঞ্জাম ব্যবহারের সুবিধা।
মিলাদ টাওয়ারটি অষ্টভুজাকার (আট কোণবিশিষ্ট) নকশায় নির্মিত। এর বহির্ভাগে প্রায় ১৭ হাজার বর্গমিটার কাচ ব্যবহার করা হয়েছে। টাওয়ারটির আনুমানিক ওজন প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার টন।
টাওয়ারের কেন্দ্রীয় কংক্রিট স্তম্ভ, যাকে "শাফট" বলা হয়, এর মধ্যে ছয়টি লিফট স্থাপন করা হয়েছে। এসব লিফটের গতি প্রতি সেকেন্ডে সর্বোচ্চ ৭ মিটার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
নির্মাণকাজের শুরুতে টাওয়ারটির নাম ছিল "ইয়াদমান টাওয়ার"। তবে ২০০১ সালে (১৩৮০ হিজরি শামসি) তেহরানের তৎকালীন পৌরসভা ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেইনির জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে এর নাম পরিবর্তন করে "মিলাদ টাওয়ার" রাখে।
অবশেষে প্রায় ১১ বছর নির্মাণকাজের পর টাওয়ারটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।
মিলাদ টাওয়ারের বিভিন্ন অংশ
মিলাদ টাওয়ার মোট ১২টি অংশ নিয়ে গঠিত। টাওয়ারের নিচতলার অংশ বা লবি দুটি ভূগর্ভস্থ তলা, একটি ভূমিতল এবং তার ওপরের তিনটি তলা নিয়ে তৈরি। এই অংশের ভূগর্ভস্থ তলাগুলোতে টাওয়ারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগত ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে। লবির অন্যান্য তলায় রয়েছে ঝরনা, ছোট জলাধার, বৃক্ষসজ্জিত স্থান, কৃত্রিম জলপ্রপাত এবং খিলানাকৃতির ছাদসহ নানা ধরনের নান্দনিক অলংকরণ। এই অংশটি বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও আয়োজনের জন্যও ব্যবহৃত হয়।
টাওয়ারের আরও দুটি অংশ হলো হস্তশিল্প গ্যালারি এবং কার্পেট ও শিল্প গ্যালারি। এখানে বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প ও শিল্পকর্ম প্রদর্শন করা হয়।
টাওয়ারের চতুর্থ অংশ হলো বন্ধ পর্যবেক্ষণ মঞ্চ, যা ভূমি থেকে ২৬১ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এখান থেকে কাচের দেয়ালের মধ্য দিয়ে তেহরান শহরের মনোরম দৃশ্য দেখা যায়। এই অংশে প্রধানত তেহরান পৌরসভার সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন বস্তু প্রদর্শিত হয়েছে।
মিলাদ টাওয়ার জাদুঘর (মিউজিয়াম অব ফেমাস ফিগারস) টাওয়ারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যেখানে ইরানের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের মূর্তি সংরক্ষিত রয়েছে।
ভূমি থেকে ২৭৬ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত ঘূর্ণায়মান রেস্তোরাঁ তেহরানের সর্বোচ্চ রেস্তোরাঁ হিসেবে পরিচিত। এটি প্রতি ঘণ্টায় একবার সম্পূর্ণ ঘুরে আসে, ফলে দর্শনার্থীরা খাবারের পাশাপাশি চারপাশের দৃশ্য উপভোগ করতে পারেন।
এরপর রয়েছে খোলা পর্যবেক্ষণ মঞ্চ, যা ভূমি থেকে ২৮০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। এই তলার বৃত্তাকার ছাদের ব্যাস প্রায় ৬০ মিটার, যা টাওয়ারের তলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় আয়তনের একটি। এখান থেকে তেহরান শহরের ৩৬০ ডিগ্রি পূর্ণাঙ্গ দৃশ্য দেখা যায়।
টাওয়ারের একটি অংশ "সারায়ে গাজা" নামে পরিচিত, যেখানে বিভিন্ন ধরনের খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়াও এখানে একটি বিশেষ ভিআইপি রেস্তোরাঁ রয়েছে, যা ভূমি থেকে ২৯২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত।
মিলাদ টাওয়ারের সর্বোচ্চ তলা ৩০২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত এবং এর নাম "আসমান গম্বুজ"। এই কাচের গম্বুজটির উচ্চতা ১৩ মিটার। এর কেন্দ্রে একটি অষ্টভুজাকার দেয়াল রয়েছে, যেখানে ইরানি পুরাণ ও প্রতীকসমূহ তুলে ধরা বিভিন্ন শিল্পকর্ম স্থাপন করা হয়েছে।
এই তলার ওপর আরও একটি ১২০ মিটার উচ্চ অ্যান্টেনা মাস্তুল স্থাপন করা হয়েছে। এর নিচের অংশ বর্গাকার হলেও উচ্চতার সঙ্গে সঙ্গে এর আকৃতি ১৬-কোণবিশিষ্ট হয়ে যায়। অ্যান্টেনাটি স্টেইনলেস স্টিল দিয়ে তৈরি এবং এটি টেলিযোগাযোগ অ্যান্টেনা ও ডিজিটাল-অ্যানালগ সংকেত শক্তিশালী করার কাজে ব্যবহৃত হয়।