এজেন্সি
ফিন উদ্যানের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

ফিন উদ্যানের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

ফিন উদ্যানের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

স্থাপত্য হলো যেকোনো সভ্যতার বাহ্যিক প্রকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। এর গভীরে বিভিন্ন জাতির বিশ্বাস, ঐতিহ্য, আচার-অনুষ্ঠান ও সৃজনশীলতার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায়। ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্থপতিরা মানুষের প্রয়োজনের ভিত্তিতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করে নিজেদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছেন এবং স্থান বিন্যাস, নির্মাণসামগ্রী ও প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষতা অর্জন করেছেন।

এভাবেই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপত্য সেই এলাকার জলবায়ু, সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিকশিত হয়েছে। ইরানি স্থাপত্যেও এমন বহু নির্মাণশৈলী, অলংকরণ ও সূক্ষ্ম বিবরণ দেখা যায়, যা ইরানের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভৌগোলিক পরিবেশের পরিচয় বহন করে।

এর মধ্যে ইরানি উদ্যান (পারস্য উদ্যান) তার অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রকৃতির প্রতি ইরানিদের গভীর ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেছে। এই উদ্যানগুলোর মধ্যে কয়েকটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকাতেও স্থান পেয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো ফিন উদ্যান, যা উনিশ শতকের ইরানের একজন গুরুত্বপূর্ণ ও সুপরিচিত রাজনীতিবিদের নামের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে গভীরভাবে যুক্ত।

ফিন উদ্যান কোথায় অবস্থিত?

ফিন উদ্যান ইরানের ইসফাহান প্রদেশের উত্তরাঞ্চলে অবস্থিত কাশান শহরের একটি ঐতিহাসিক উদ্যান। ফিন উদ্যানের খ্যাতি এতটাই ব্যাপক যে এটিকে কাশান শহরের অন্যতম প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কাশান শহর মধ্য ইরানের পর্বতময় কারকাস পর্বতমালা এবং মরু অঞ্চলের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। এই বিশেষ ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে এলাকাটি গোলাপ (গোল-এ মোহাম্মদি) চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। প্রচলিতভাবে বলা হয়, ইরানের উৎকৃষ্টতম গোলাপজল কাশানেই উৎপাদিত হয়।

কাশানে মানুষের বসবাসের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। এখানকার বিখ্যাত সিয়ালক টিলা (তেপ্পে-ই সিয়ালক) আবিষ্কারের ভিত্তিতে ধারণা করা হয় যে, এই অঞ্চলে মানুষের বসতি প্রায় ,০০০ বছর পুরোনো। সিয়ালক টিলাগুলো ফিন উদ্যান থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ফিন উদ্যানের ইতিহাস

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, ফিন উদ্যানের প্রতিষ্ঠা সাফাভি যুগে (ষোড়শ শতাব্দী) হয়েছিল। তবে অন্য একদল গবেষকের ধারণা, এই উদ্যানের সূচনা এরও পূর্ববর্তী সময়ে। নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, ১৫৭২ সালে কাশানের বহু এলাকা ধ্বংসকারী এক ভয়াবহ ভূমিকম্পে ফিন উদ্যানও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধারণা করা হয়, এই ঘটনার পর দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ ও ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় থাকার কারণে স্থানীয় মানুষ উদ্যানটিকে "বাগ-এ কেহনে" (পুরোনো উদ্যান) নামে ডাকত। পরবর্তীকালে সাফাভি শাসক শাহ আব্বাস প্রথম (শাসনকাল ১৫৮৭–১৬২৯ খ্রিস্টাব্দ) এই স্থাপনাটির সংস্কার করেন এবং নিজের অবদানের স্মারক হিসেবে এর নাম পরিবর্তন করে "বাগ-এ নও" (নতুন উদ্যান) রাখেন।



প্রাসাদসদৃশ বাগানভবন 

ফিন উদ্যান: আমির কবিরের হত্যাস্থল

আমির কবির ছিলেন কাজার শাসক নাসিরউদ্দিন শাহের (শাসনকাল ১৮৪৮–১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দ) প্রথম প্রধানমন্ত্রী (সদর-এ আজম) এবং তিনি প্রায় তিন বছর এই পদে দায়িত্ব পালন করেন।

যদিও আমির কবিরের প্রশাসনিক দায়িত্বের সময়কাল খুব দীর্ঘ ছিল না, তবে তাঁর গৃহীত সংস্কারমূলক পদক্ষেপগুলো এতটাই ব্যাপক ও কার্যকর ছিল যে, তাঁকে ইরানের ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

নিজের প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ পর্যায়ে রাজদরবারের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং বিদেশি শক্তির ষড়যন্ত্রের কারণে আমির কবির নাসিরউদ্দিন শাহের বিরাগভাজন হন। তাঁকে কাশানে নির্বাসিত করা হয় এবং সেখানে ফিন উদ্যানের হাম্মামে তাঁকে হত্যা করা হয় ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে (১২৩০ হিজরি শামসি)

আমির কবিরের হত্যার পর নাসিরউদ্দিন শাহ বহুবার নিজের সিদ্ধান্তের জন্য অনুতাপ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এই ঘটনার মাধ্যমে তাঁর নিজের ভাবমূর্তি এবং ইরানের ইতিহাসে যে গভীর ক্ষত সৃষ্টি হয়েছিল, তা আর কখনো পূরণ করা সম্ভব হয়নি।

ফিন উদ্যানের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য

ইরানে "ফিন" নামে পরিচিত বেশ কয়েকটি স্থান রয়েছে। ধারণা করা হয়, যেসব স্থানে প্রচুর পরিমাণে পানি প্রবাহিত হতো, সেসব স্থানকে ফিন নামে অভিহিত করা হতো। বর্তমান স্থানে ফিন উদ্যান নির্মাণের অন্যতম প্রধান কারণও ছিল এখানে প্রচুর পানির উপস্থিতি।

বর্তমানেও ফিন উদ্যান ও এর আশপাশের এলাকায় একটি জলধারা প্রবাহিত হয়, যার উৎস হলো "চেশমেহ সোলেইমানিয়েহ" (সোলেইমানিয়েহ ঝরনা)। উদ্যানের প্রাঙ্গণে সারি সারি সাইপ্রাস (সারভ) ও চেনার গাছ রোপণ করা হয়েছে। এখানে বৃহৎ ও প্রাচীন গাছের সংখ্যা ৫০০টিরও বেশি। এসব গাছের কিছু কিছুটির বয়স আনুমানিক ৪৫০ বছরের বেশি বলে ধারণা করা হয়।

কিছু বিশেষজ্ঞের ধারণা, এই উদ্যানের নকশাকার হতে পারেন চতুর্দশ ও পঞ্চদশ শতাব্দীর বিখ্যাত গণিতবিদ গিয়াসউদ্দিন জামশিদ কাশানি, অথবা ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও দক্ষ স্থপতি শেখ বাহাই

ফিন উদ্যানের অন্যতম অনন্য আকর্ষণ হলো ফিরোজা রঙের টাইলস দিয়ে সজ্জিত একটি বৃহৎ জলাধার। উদ্যানের পেছনের অংশে আরেকটি ছোট জলাধার নির্মিত হয়েছে, যেখান থেকে মাটির তৈরি নল (তানবুশে) এর মাধ্যমে পানি উদ্যানের ফোয়ারাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

ফিন উদ্যানের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

ফিন উদ্যান ১৯৩৫ সালে (১৩১৪ হিজরি শামসি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

এই স্থাপনাটির বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি আসে ২০১১ সালে (১৩৯০ হিজরি শামসি), যখন "ইরানি উদ্যান" শিরোনামে ইরানের ৯টি ঐতিহাসিক উদ্যানকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই তালিকাভুক্ত উদ্যানগুলোর অন্যতম ছিল কাশানের বিখ্যাত ফিন উদ্যান

 
ফিন উদ্যানের স্থাপত্য ও বৈশিষ্ট্য
ইসফাহান
কাশান
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: