এজেন্সি
শিরাজের ওয়াকিল গোসলখানা জাদুঘর, ইরানি গোসলখানা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ।

শিরাজের ওয়াকিল গোসলখানা জাদুঘর, ইরানি গোসলখানা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ।

শিরাজের ওয়াকিল গোসলখানা জাদুঘর, ইরানি গোসলখানা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ।

কারিম খান জন্দ ও ওয়াকিল গোসলখানার ইতিহাস

কারিম খান জন্দ, জান্দিয়া রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা (অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ), ক্ষমতায় আসার পর শিরাজকে তাঁর রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন এবং সেখানে বহু স্থাপনা নির্মাণ করেন। ওয়াকিল বাজার, ওয়াকিল মসজিদ, ওয়াকিল মাদ্রাসা এবং ওয়াকিল গোসলখানা এসব স্থাপনা কারিম খানের শাসনামলে নির্মিত হয়েছিল।

ওয়াকিল গোসলখানার স্থাপত্য

ইরানি গোসলখানাগুলো প্রাচীনকাল থেকে পাহলভি যুগ পর্যন্ত সাধারণত তিনটি প্রধান অংশ নিয়ে নির্মিত হতো। এই অংশগুলো হলো:

  • সারবিনেহ (প্রবেশ ও বিশ্রাম কক্ষ)
  • মিয়ানদার (মধ্যবর্তী সংযোগস্থল)
  • খাজিনেহ বা গরমখানা (উষ্ণ স্নানকক্ষ)

এই ধরনের গোসলখানাকে সাধারণত "খাজিনেহ গোসলখানা" বলা হতো। এতে গরম পানি একটি বিশেষ জলাধারে (খাজিনেহ) সংরক্ষণ করা হতো।

পানির পাইপলাইন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ধীরে ধীরে খাজিনেহ গোসলখানার  পরিবর্তে "নমরে গোসলখানা" প্রচলিত হয়। এসব হাম্মামে আলাদা আলাদা কক্ষ তৈরি করা হতো এবং প্রতিটি কক্ষে পৃথক ঝরনার ব্যবস্থা থাকত।

অতীতে ইরানের শহরগুলোতে গোসলখানার  বিশেষ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব ছিল। এগুলো ছিল স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা সেবার প্রধান কেন্দ্র। তবে বর্তমানে প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নিজস্ব গোসলখানা থাকায় ইরানের বিভিন্ন শহরে গণগোসলখানার  সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

সারবিনেহ

সারবিনেহ বা পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ ছিল গোসলখানায়  প্রবেশের পর মানুষের প্রথম অবস্থানের স্থান। ইরানি গোসলখানাগুলোর মধ্যে ওয়াকিল গোসলখানার সারবিনেহ বিশেষভাবে আলাদা, কারণ এখানে স্থানীয় উপভাষায় "ভাসুনকখানি" নামে একটি ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান পালিত হতো।

সারবিনেহর প্রবেশপথে হাম্মামি নামে একজন ব্যক্তি উপস্থিত থাকতেন। গোসলখানায় আগত ব্যক্তিদের মূল্যবান জিনিসপত্র তিনি গ্রহণ করে নির্দিষ্ট স্থানে সংরক্ষণ করতেন। এছাড়াও তিনি গোসলখানার  সেবা গ্রহণের বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে পারিশ্রমিক সংগ্রহ করতেন। গোসলখানার ব্যবস্থাপনা, পানি গরম করা এবং জ্বালানি সরবরাহের মতো কাজও হাম্মামির দায়িত্বে ছিল। বড় গোসলখানাগুলোতে কয়েকজন সহকারী হাম্মামির কাজে সহযোগিতা করতেন।

ওয়াকিল গোসলখানার সারবিনেহতে বিভিন্ন আসন বা স্থান ছিল, যেখানে প্রত্যেক ব্যক্তি তাঁর সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী অবস্থান গ্রহণ করতেন।

সারবিনেহর একটি অংশে ছিল ঠান্ডা পানির একটি জলাধার। গোসল শেষে এবং গোসলখানা থেকে বের হওয়ার সময় মানুষ এতে পা রাখতেন। বিশ্বাস করা হতো, এতে রোগ ও ঠান্ডা লাগা প্রতিরোধ হয়। ওয়াকিল গোসলখানার সারবিনেহর মাঝখানেও একটি বড় জলাধার রয়েছে, যার নির্মাণে মূলত সৌন্দর্য ও অলংকারের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

ওয়াকিল হাম্মামে "নাক্কাল" নামে একজন গল্পকথকও থাকতেন, যিনি উচ্চস্বরে মানুষের কাছে প্রতিদিনের খবর বর্ণনা করতেন। কখনো কখনো তিনি সারবিনেহর ছাদে আঁকা চিত্র ব্যবহার করে বিভিন্ন গল্পও উপস্থাপন করতেন।

গোসলখানার ছাদে প্লাস্টারের (গচ্চ) পরিবর্তে চুনের খোদাই কাজ (আহাকবোরি) ব্যবহার করা হতো। কারণ প্লাস্টারের বিপরীতে চুন আর্দ্র পরিবেশে আরও শক্ত হয়ে যায়। সারবিনেহর ছাদের চারপাশজুড়ে চুনের খোদাই করা অলংকরণ রয়েছে, যেখানে বিভিন্ন সাহিত্যিক ও ধর্মীয় কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে।

এই কাহিনিগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মেরাজের ঘটনা
  • ইব্রাহিম (আ.) কর্তৃক ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানির প্রস্তুতির কাহিনি
  • শিরিন ও ফরহাদ এবং ফরহাদের মাধ্যমে বিসতুন পর্বত খোদাই করার কাহিনি
  • বিজন ও মনিজেহ-এর কাহিনি
  • ঝরনায় শিরিনের গোসল এবং শিকারক্ষেত্রে খসরুর দৃশ্য
  • নবী ইউসুফ (আ.)-কে কূপে নিক্ষেপের ঘটনা
  • কূপ থেকে ইউসুফ (আ.)-কে উদ্ধারের ঘটনা
  • ইউসুফ (আ.)-এর মিশরের আজিজ নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা
  • নারীদের ভোজসভায় ইউসুফ (আ.)-এর উপস্থিতির ঘটনা
  • শেখ সানআনের খ্রিস্টান কন্যার প্রেমে পড়ার কাহিনি

মিয়ানদার

মিয়ানদার হলো সেই স্থান, যা সারবিনেহ (পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ) এবং খাজিনেহ (গরমখানা)–কে একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত করে। প্রাচীন ইরানিদের বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি ঐতিহ্যবাহী রীতি হেনাবান্দান (মেহেদি অনুষ্ঠান) এই অংশে অনুষ্ঠিত হতো।

বিয়ের অনুষ্ঠানে বর ও কনের পরিবারের প্রত্যেকটি পক্ষ এই স্থানটি নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট করে নিত। "ঘোরক করা" বলতে কোনো স্থানকে ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নির্ধারণ করা এবং সেখানে অপরিচিতদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করাকে বোঝায়। এছাড়াও বিশেষ সময়ে, যেমন শিশুর জন্ম উপলক্ষে, মিয়ানদারে অন্যান্য বিশেষ অনুষ্ঠানও অনুষ্ঠিত হতো।

খাজিনেহ (গরমখানা)

মিয়ানদার একটি করিডোরের মাধ্যমে খাজিনেহ (গরমখানা)-র সঙ্গে যুক্ত ছিল। এই করিডোর মানুষের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত, যাতে হঠাৎ অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা পরিবেশে প্রবেশের কারণে রক্তচাপ কমে যাওয়ার সমস্যা না হয়।

খাজিনেহতেই গোসল করা হতো। সেখানে দাল্লাক নামে একজন ব্যক্তি গ্রাহকদের পরিচ্ছন্নতার কাজে সহায়তা করতেন। দাল্লাক মানুষের জন্য বিভিন্ন সেবা দিতেন, যেমন:

  • শরীর ঘষে পরিষ্কার করা (কিসে টানা)
  • কোমরে কাপড় বাঁধতে সহায়তা করা
  • শরীর মালিশ করা
  • দাঁত তোলা
  • হিজামা (শিঙা লাগিয়ে চিকিৎসা)

শিরাজের ওয়াকিল গোসলখানা জাদুঘর

বর্তমানে অন্যান্য প্রাচীন গোসলখানার মতো ওয়াকিল গোসলখানাও তার মূল ব্যবহার হারিয়েছে এবং এটি একটি জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

গোসলখানার বিভিন্ন অংশে মোম দিয়ে তৈরি ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে, যাতে গোসলখানা ব্যবহারের বিভিন্ন ধাপ প্রদর্শন করা যায়। মিয়ানদার অংশে ঐতিহ্যবাহী শিরাজি পোশাক পরিহিত কিছু ভাস্কর্যও দেখা যায়, যারা বিভিন্ন প্রাচীন অনুষ্ঠান পালন করছে।

এই জাদুঘর পরিদর্শনের মাধ্যমে পর্যটকরা ইরানি গোসলখানার কার্যপ্রণালী এবং ইরানের মানুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য জানতে পারেন।

 

শিরাজের ওয়াকিল গোসলখানা জাদুঘর, ইরানি গোসলখানা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার একটি সুযোগ।
ফার্স
শিরাজ
Social

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: