কুফতেগারি ধাতব সামগ্রী অলংকরণের অন্যতম একটি পদ্ধতি। ব্যবহৃত ধাতুর ধরন অনুযায়ী এই শিল্প বিভিন্ন নামে পরিচিত হতে পারে। এই কৌশলে শিল্পী এমনভাবে ধাতুকে পিটিয়ে বসান, যাতে পিটিয়ে বসানো ধাতুটি মূল ধাতব পৃষ্ঠের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়।
কুফতেগারি শিল্পের ইতিহাস
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে আমরা যে শিল্পকে কুফতেগারি নামে চিনি, তা এমন একটি শিল্পের বিকশিত রূপ, যার উৎপত্তি হাখামানেশীয় যুগে (খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে)। সেই সময় সিলমোহর তৈরি এবং তলোয়ার, ঢাল বা বর্মের মতো যুদ্ধাস্ত্র অলংকরণের জন্য এই কৌশল ব্যবহার করা হতো।
পরবর্তী শতাব্দীগুলোতেও কুফতেগারি তার অস্তিত্ব বজায় রাখে। তবে সেলজুক যুগে (১০৩৭ থেকে ১১৯৪ খ্রিস্টাব্দ) এই শিল্পে আরও বেশি পরিবর্তন ও বিস্তার ঘটে। এরপর সাফাভি শাসন প্রতিষ্ঠার (খ্রিস্টীয় ষোড়শ শতাব্দী) পর এবং ইরানে শিয়া মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলে, শোকানুষ্ঠানের প্রতীক বা আলামত অলংকরণের জন্য কুফতেগারি ব্যবহার করা শুরু হয়। এ সময় আলামত সাজানোর জন্য বিভিন্ন প্রাণীর অবয়বও ব্যবহার করা হতো, ফলে কুফতেগারি শিল্পের প্রতি আগ্রহ ও গুরুত্ব আগের তুলনায় আরও বৃদ্ধি পায়। পরবর্তীকালে কাজার শাসনামলেও (খ্রিস্টীয় ঊনবিংশ শতাব্দী) আলামত নির্মাণের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে কুফতেগারি তার অবস্থান ধরে রাখে। বর্তমানেও এই শিল্প ভাস্কর্য নির্মাণ, ধাতব সামগ্রী অলংকরণ এবং শোকানুষ্ঠানের আলামত তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
কুফতেগারি শিল্পের বৈশিষ্ট্য ও ব্যবহৃত কৌশল
কুফতেগারি শিল্পীরা কাজের পৃষ্ঠে নিজেদের নকশা ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রথমে তা কাগজে আঁকেন। এরপর নকশাটি স্টিলের ওপর স্থানান্তর করার পর কাটাইয়ের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী ধাপে স্টিলের পাতটিকে চুল্লিতে নিয়ে গিয়ে ভালোভাবে উত্তপ্ত করা হয়, যতক্ষণ না তা লাল হয়ে ওঠে। স্টিল লাল হয়ে গেলে সেটিকে নেহাইয়ের ওপর রেখে হাতুড়ি দিয়ে পেটানো হয়, যতক্ষণ না শিল্পীর কাঙ্ক্ষিত আকৃতি পাওয়া যায়। সবশেষে বিভিন্ন অংশ পরস্পরের সঙ্গে ঝালাই করা হয়, যাতে একটি পূর্ণাঙ্গ আকৃতি তৈরি হয়। কাঙ্ক্ষিত আকৃতি বা আয়তন তৈরি হওয়ার পর কুফতেগারির মূল কাজ শুরু হয়। এ পর্যায়ে সোনা, রুপা, পিতল বা তামার তৈরি তার কাজের পৃষ্ঠের ওপর পিটিয়ে বসানো হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন অলংকারিক নকশা তৈরি হয়। তারগুলো পিটিয়ে বসানোর আগে বিশেষ সূচালো হাতুড়ি দিয়ে কাজের পৃষ্ঠে আঁচড় কাটা হয়, যাতে তার বসানোর জন্য খাঁজ তৈরি হয়। কখনো কখনো কুফতেগারি শিল্পী কাজের পৃষ্ঠে আঘাত করেন, যাতে নকশাটির গভীরতা আরও বৃদ্ধি পায়। যে বস্তুর ওপর কুফতেগারি করা হয়, সেটি বড় ও ত্রিমাত্রিক হতে পারে, যেমন একটি ভাস্কর্য; আবার খুব সূক্ষ্ম ও ছোটও হতে পারে, যেমন তসবিহ বা ছুরির হাতল। প্রয়োজন হলে কুফতেগারির আরেকটি ধাপ হিসেবে ‘জশমকুবি’ করা হয়। এই ধাপে জশম পাথরকে তারগুলোর ওপর ঘষে দেওয়া হয়, যাতে সেগুলো খাঁজের ভেতরে ঢুকে স্থায়ীভাবে বসে যায়। কখনো কখনো জশমের পরিবর্তে আকিক পাথরও ব্যবহার করা হয়।
সবশেষে কাজের পৃষ্ঠটি পালিশ করা হয়, যাতে এর সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায় এবং আগের ধাপগুলো থেকে অবশিষ্ট ময়লা দূর হয়। পৃষ্ঠ পালিশ করার কাজে পানি, অ্যাসিড এবং পরিষ্কার করার বিভিন্ন উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এ পর্যায়ে আগুনের শিখাও ব্যবহার করা হয়। কারণ তাপ শুধু ওপরের স্তরটিকে আরও মজবুত করে না, এটিকে আরও চকচকে করে তোলে।
কুফতেগারিতে ব্যবহৃত ধাতুর ওপর নির্ভর করে এই শিল্পকে ‘তালাকুবি’ (সোনার কাজ), ‘নোগরেকুবি’ (রুপার কাজ) অথবা ‘বরেঞ্জকুবি’ (পিতলের কাজ) নামেও অভিহিত করা হতে পারে। তবে এগুলোর মধ্যে কিছু পার্থক্য রয়েছে। যেমন, রুপা বা সোনার কাজ করার সময় তারগুলো তুলনামূলকভাবে পাতলা ও নরম হওয়ায় সেগুলো পিটিয়ে বসানোর কাজ আরও বেশি সতর্কতা ও সূক্ষ্মতার সঙ্গে করতে হয়। এ কারণেই এসব কাজে ব্যবহৃত হাতুড়িও ভিন্ন ধরনের হয়। বর্তমানে তেহরান, ইসফাহান ও মাশহাদ ইরানে রুপার কাজের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়। বর্তমানে ভাস্কর্য নির্মাণের পাশাপাশি মহররমের ‘আলাম’ এবং কিছু ধাতব পাত্র অলংকরণেও এই কৌশল ব্যবহার করা হয়। ইরানিদের অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার মহররমের শোকানুষ্ঠানের সঙ্গে কুফতেগারির সম্পর্ক গড়ে ওঠা এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ, যা ইতিহাসজুড়ে এই শিল্পকে জীবন্ত ও গতিশীল রাখতে সহায়তা করেছে।
এই শিল্পে পৃষ্ঠতল অলংকরণের জন্য ব্যবহৃত নকশার মধ্যে ‘ইসলিমি’ ও ‘তোরঞ্জ’ উল্লেখযোগ্য। এই নকশাগুলোর ব্যবহার ইরানে কুফতেগারি শিল্পের ঐতিহ্য ও মৌলিক বৈশিষ্ট্য সংরক্ষিত থাকার প্রমাণ দেয়। পটভূমির ধাতু এবং তার ওপর পিটিয়ে বসানো ধাতুর রঙের পার্থক্য কুফতেগারি শিল্পের অন্যতম সৌন্দর্য উপাদান। সাধারণত কাজের পৃষ্ঠটি গাঢ় রঙের হয় এবং তার ওপর বসানো ধাতুটি তুলনামূলকভাবে উজ্জ্বল রঙের হয়।