ইয়াজদি কফি একটি পানীয়, যা ইয়াজদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানেও স্থান করে নিয়েছে।
বিশ্বজুড়ে কফি একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় পানীয়। তবে ইরানে চায়ের অনুরাগীর সংখ্যা কফিপ্রেমীদের তুলনায় বেশি। তা সত্ত্বেও দেশের কিছু অঞ্চলে কফির উপস্থিতি বেশ উল্লেখযোগ্য, এমনকি সেখানে এটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ হয়ে উঠেছে। ইয়াজদ এমনই একটি অঞ্চল, যেখানে কফি প্রস্তুতের রয়েছে নিজস্ব রীতি ও বিশেষ পদ্ধতি।
ইয়াজদে কফির ইতিহাস
ধারণা করা হয়, কাজার যুগে (ঊনবিংশ শতাব্দী) ইয়াজদে কফির প্রচলন শুরু হয়েছিল। যদিও কেউ কেউ এর ইতিহাস চার শতাব্দী আগের বলে মনে করেন। বলা হয়, শুরু থেকেই ইয়াজদবাসীরা কফির স্বাভাবিক তেতো স্বাদ খুব একটা পছন্দ করতেন না। তাই তারা কফি তৈরির একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন এবং নিজেদের রুচি অনুযায়ী এর স্বাদ পরিবর্তন করেন।
ধীরে ধীরে এই বিশেষ পদ্ধতিটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং কফিপ্রেমীদের কাছে "ইয়াজদি কফি" নামে পরিচিতি লাভ করে।
আপনি যদি ইয়াজদ ভ্রমণ করেন, তবে সেখানকার নানা ধরনের মিষ্টান্ন দেখে নিশ্চয়ই বিস্মিত হবেন। কারণ ইয়াজদবাসীরা মিষ্টি স্বাদের প্রতি বিশেষভাবে অনুরাগী। কফি তৈরির পদ্ধতিতেও সেই রুচির প্রতিফলন দেখা যায়। তারা কফিতে এতটাই মিষ্টতা যোগ করেন যে এর স্বাভাবিক তিক্ততা অনেকটাই কমে যায় এবং তা তাদের মিষ্টিপ্রিয় স্বভাবের সঙ্গে মানিয়ে যায়।
এই পদ্ধতি এতটাই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে ইয়াজদি কফি ধীরে ধীরে ইয়াজদের শোকানুষ্ঠান ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানেরও অংশ হয়ে যায়। এ কারণে একে "শোকের কফি" (قهوه عزاداری) নামেও ডাকা হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই ইয়াজদবাসীরা মৃত ব্যক্তির মৃত্যুর তৃতীয় দিনে একটি স্মরণসভা আয়োজন করেন এবং সেখানে তাদের নিজস্ব পদ্ধতিতে প্রস্তুত করা কফি পরিবেশন করেন।
কফি কীভাবে এই ধরনের অনুষ্ঠানের অংশ হয়ে উঠল এ নিয়ে বিভিন্ন মত রয়েছে। কেউ বলেন, কফির ক্যাফেইন মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দেয়। আবার কেউ মনে করেন, ইয়াজদি কফির মিষ্টতা প্রিয়জন হারানোর বেদনা কিছুটা লাঘব করার প্রতীক। অন্যদের মতে, কফির কালো রঙ ইরানে শোকের প্রতীক কালো রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইয়াজদে মহররম মাসের শোকানুষ্ঠানেও ইয়াজদি কফি বিশেষ গুরুত্ব পায়। ইমাম হুসাইনের শাহাদাতের তৃতীয় দিনের শোকানুষ্ঠান, এমনকি তাসুয়া ও আশুরার (মহররমের নবম ও দশম দিন) সময়ও শোকপালনকারীদের মধ্যে এই কফি বিতরণ করা হয়।
ইয়াজদি কফি প্রস্তুতের পদ্ধতি
ঐতিহ্যবাহী ইয়াজদি কফি প্রস্তুতের জন্য একটি বড় তামার পাত্র এবং একটি বড় হাতা ব্যবহার করা হয়, যাকে ইয়াজদি উপভাষায় "কমচেলি" (کمچَلی) বলা হয়।
এই কফি তৈরির জন্য আগুনের উৎস হিসেবে কাঠকয়লা ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে কেইচ (قیچ) গাছের কাঠকয়লা ব্যবহার করাই উত্তম বলে মনে করা হয়, কারণ এই কয়লায় ছাই খুব কম হয়।
ইয়াজদি কফির অন্যান্য প্রধান উপাদান হলো—
- নাবাত (স্ফটিক চিনি)
- এলাচ
- গোলাপজল
ইয়াজদের নাবাত সারা ইরানেই বিখ্যাত। কারণ ইয়াজদবাসীরা নাবাত দিয়ে চা পান করতে ভালোবাসেন। সেই নাবাতই ইয়াজদি কফিকে মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য কখনও কখনও নাবাতের পরিবর্তে সাধারণ চিনিও ব্যবহার করা হয়।
ইয়াজদবাসীরা কফিতে গোলাপজলও যোগ করেন। ইয়াজদের কাছে দেহ-বালা (دهبالا) নামে একটি গ্রাম রয়েছে, যা গোলাপের বাগান ও উৎকৃষ্ট মানের গোলাপজলের জন্য বিখ্যাত। ইয়াজদবাসীদের বিশ্বাস, আসল ইয়াজদি কফির সুবাস তখনই সম্পূর্ণ হয়, যখন এতে দেহ-বালার খাঁটি গোলাপজল ব্যবহার করা হয়।
বর্তমানে ইয়াজদ শহরের বহু রেস্তোরাঁ, চা-ঘর, ঐতিহ্যবাহী আবাসন ও ইকো-লজে পর্যটকদের ইয়াজদি কফি পরিবেশন করা হয়।
এই কফি সাধারণ কাপে নয়, বরং ছোট গ্লেজযুক্ত মাটির বাটিতে পরিবেশন করা হয়, যাতে এর পরিবেশন পদ্ধতিতেও ইয়াজদের নিজস্ব স্বাক্ষর ফুটে ওঠে।
জাতীয় ঐতিহ্য হিসেবে নিবন্ধন
ইয়াজদি কফির বিশেষ প্রস্তুতপ্রণালী, ইয়াজদবাসীদের রুচি অনুযায়ী এর স্বাদের পরিবর্তন এবং শোকানুষ্ঠান ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে এর বিশেষ স্থান লাভ—এসব কারণে ২০১৭ সালে (ইরানি সৌর বর্ষ ১৩৯৬) ইয়াজদি কফি ইরানের জাতীয় অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
| ইয়াজদি কফি একটি পানীয়, যা ইয়াজদের ধর্মীয় ও ঐতিহ্যবাহী আচার-অনুষ্ঠানেও স্থান করে নিয়েছে। | |
| ইয়াজদ | |
| Dessert and side dish | |
| Registration |





