এজেন্সি
পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই ও তার রহস্যে ঘেরা অজানা কাহিনি

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই ও তার রহস্যে ঘেরা অজানা কাহিনি

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই ও তার রহস্যে ঘেরা অজানা কাহিনি

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই (বিশ্রামাগার)

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই, যাকে কখনো সংক্ষেপে পাথরের দুর্গ নামেও ডাকা হয়, ইরানের সেই ৫৪টি কারাভানসারাইয়ের একটি, যেগুলো ২০২৩ সালে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই কারাভানসারাইটি এর ভেতরে লুকিয়ে থাকা নানা রহস্যের কারণে বিশেষভাবে পরিচিত। আর সেই রহস্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এখানে আবিষ্কৃত বেশ কয়েকটি মানুষের কঙ্কাল।

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই কোথায় অবস্থিত?

এই স্থাপনাটি ইরানের মধ্যাঞ্চলে, তেহরান প্রদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে, রাবাত কারিম কাউন্টির পারান্দ শহরের এলাকায় অবস্থিত। বর্তমানে কারাভানসারাইটির অবস্থানটি পুরোনো সাভে সড়ক ও তেহরান–সাভে মহাসড়কের সংযোগস্থলের খুব কাছেই। ফলে এখানে সহজেই পৌঁছানো যায়।

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য

কেন্দ্রীয় ভবনের বিশেষ ধরনের স্থাপত্য দেখে কিছু সূত্রে এই কারাভানসারাইটির বয়স প্রায় ,৫০০ বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মত হলো, এটি বুয়াইহি শাসনামলে (৯৪৫–১০৫২ খ্রিষ্টাব্দ) নির্মিত হয়েছিল। দুর্গ থেকে পাওয়া বিভিন্ন প্রমাণের ভিত্তিতে কিছু ইতিহাসবিদ মনে করেন, পুরো স্থাপনাটি নির্মাণ করতে ২০০ বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

ইরানের মধ্যাঞ্চলের অন্যান্য স্থাপনার ক্ষেত্রে যেখানে সাধারণত নির্মাণের প্রধান উপকরণ হিসেবে কাঁচা ইট ব্যবহার করা হতো, সেখানে এই কারাভানসারাইটি পাথর দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল। পাথর ব্যবহার করায় ভবনটি নির্মাণ করা যেমন কঠিন হয়েছিল, তেমনি এর খরচও অনেক বেড়ে গিয়েছিল। তবে এর মধ্য দিয়ে স্থাপনাটির কৌশলগত গুরুত্বও বোঝা যায়।

পাথর ভবনটিকে আরও শক্ত ও মজবুত করে তুলেছিল। একই সঙ্গে এটি ইঙ্গিত দেয় যে অতীতে এই অঞ্চলে হামলাকারীদের আক্রমণের আশঙ্কা কতটা বেশি ছিল। স্থাপনাটির এমন শক্ত কাঠামোর কারণেই একে দুর্গ বা “পাথরের দুর্গ” বলা হয়। তবে এই নামের সঙ্গে স্থাপনাটির ব্যবহারও সম্পর্কিত। কারণ কারাভানসারাইটির ইতিহাসের অন্তত একটি পর্যায়ে এটিকে সামরিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, একসময় এই কারাভানসারাইয়ে স্থানীয় শাসকেরাও অবস্থান করতেন। কিছু ঐতিহাসিক সূত্রে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, কারাভানসারাইটির আশপাশে উর্বর বিস্তীর্ণ জমি থাকায় এখান থেকে ওই কৃষিজমিগুলোর ওপর নজরদারি ও তদারকি করা হতো। অর্থাৎ, এটি শুধু পথিক ও বণিকদের বিশ্রামের স্থান ছিল না; বরং সামরিক ও প্রশাসনিক দিক থেকেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের স্থাপত্য ও রহস্য

অন্যান্য অনেক ইরানি কারাভানসারাইয়ের মতো পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের মূল নকশাও চার-ইওয়ানবিশিষ্ট। কারাভানসারাইটির মাঝখানে রয়েছে একটি বড় উঠান। উঠানের চারপাশে তৈরি করা হয়েছে সাধারণ আকৃতির কয়েকটি কক্ষ, যেগুলোর দরজা উঠানের দিকে খোলে। ভবনের দেয়ালের মাঝামাঝি অংশে তিনটি অর্ধবৃত্তাকার বুরুজ এবং ঠিক চার কোণে চারটি গোলাকার বুরুজ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বুরুজে প্রহরীরা অবস্থান করতেন। এছাড়া কখনো কখনো বুরুজের ওপর আগুন জ্বালানো হতো, যাতে রাতের বেলা দূর থেকে আসা কাফেলাগুলো সহজে তাদের পথ খুঁজে নিতে পারে। তবে এই বুরুজগুলোর আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ব্যবহার ছিল। এগুলো কারাভানসারাইয়ের মোটা ও ভারী দেয়াল ধরে রাখার জন্য শক্ত ভিত্তি হিসেবেও কাজ করত। ভবনের চার কোণে গম্বুজাকৃতির ছাদসহ চারটি বর্গাকার কক্ষ নির্মাণ করা হয়েছে। পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের ভেতরে লুকিয়ে আছে আরও অনেক রহস্য ও বিস্ময়। এর মধ্যে অন্যতম হলো একটি পানির কূপ। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অল্প গভীরতাতেই এই কূপে পানি পাওয়া যায় এবং বছরের সব সময়ই এতে পর্যাপ্ত পানি থাকে। অথচ আশপাশের এলাকায় ১০০ মিটারেরও বেশি গভীর কূপ খনন করেও পানি পাওয়া যায় না। তবে এই স্থাপনার সবচেয়ে বড় রহস্য হলো এখানে আবিষ্কৃত ২৩টি মানুষের কঙ্কাল। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, প্রায় ৬৫০ বছর আগে, সেলজুক শাসনামলে এই কারাভানসারাইয়ের ভেতরে এসব কবর তৈরি করা হয়েছিল।

পাথরের দুর্গে আবিষ্কৃত প্রথম কঙ্কালটি ছিল মধ্যবয়স্ক এক ব্যক্তির। তাকে চিৎ হয়ে শুইয়ে কবর দেওয়া হয়েছিল। তার মাথা ও মুখের হাড় ভেঙে যাওয়ার চিহ্ন দেখে ধারণা করা হয়, তাকে হত্যা করা হয়েছিল। পুরো শরীরটি ছাইয়ে ঢাকা ছিল। ফলে দেহটি অনেকটা জীবাশ্মের মতো শক্ত হয়ে গিয়েছিল। এ কারণেই কঙ্কালটি তুলনামূলকভাবে ভালোভাবে সংরক্ষিত ছিল এবং এমনকি তার চুলও সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল।

কঙ্কালগুলোর অস্বাভাবিকভাবে কবর দেওয়ার ধরন এবং তাদের শরীরে থাকা গুরুতর আঘাতের চিহ্ন থেকে ধারণা করা হয়, সেখানে হত্যাকাণ্ড ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছিল। মৃতদেহগুলো তাড়াহুড়ো করে কবর দেওয়া হয়েছিল। এমনকি কিছু কিছু কবরে একটির ওপর আরেকটি করে একাধিক মৃতদেহ পাওয়া গেছে।

আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেই সময় ইরানে ইসলাম ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লেও মৃতদেহগুলোকে কাফন ছাড়াই সাধারণ পোশাক পরা অবস্থায় দাফন করা হয়েছিল। কারাভানসারাইয়ে খননকাজ চালানোর সময় বিভিন্ন ধরনের সরঞ্জাম ও কিছু পাথরের গোলকও পাওয়া গেছে। এসব গোলক দেখতে এমন কিছু অস্ত্র বা সরঞ্জামের মতো, যেগুলো মঙ্গোলরা যুদ্ধের সময় জাদুর প্রভাব নষ্ট করার কাজে ব্যবহার করত বলে ধারণা করা হয়। এসব আবিষ্কারকে একসঙ্গে বিবেচনা করে একটি ধারণা আরও জোরালো হয়েছে ১২১৯ খ্রিষ্টাব্দে মঙ্গোলদের ইরান আক্রমণের সময় পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের বাসিন্দাদের হত্যা করা হয়েছিল। তবে এখনো পর্যন্ত এই ধারণার পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের জাতীয় ও বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি

২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে পাথরের দুর্গের কারাভানসারাইয়ের নাম ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। পরবর্তীতে ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দে এটি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায়ও স্থান পায়।

 

পাথরের দুর্গের কারাভানসারাই ও তার রহস্যে ঘেরা অজানা কাহিনি
তেহরান
পারন্দ
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: