গ্রিক জাহাজ এবং এর আকর্ষণীয় ইতিহাস
কিছু ঘটনা শুরুতে অপ্রত্যাশিত বা দুঃখজনক মনে হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতে সেই তিক্ত ঘটনা গুলো মানুষের স্মৃতিতে স্থান পেতে পারে এবং তাদের সংস্কৃতি ও জীবনের অংশ হয়ে উঠতে পারে। সম্ভবত যেদিন “গ্রিক জাহাজ”-এর মালিক ও যাত্রীরা তাদের জাহাজটি আটকে যাওয়া এবং নিজেদের সম্পদ হারানোর দৃশ্য দেখেছিলেন, তারা কল্পনাও করেননি যে এই ঘটনাই পরে কিশ দ্বীপের অন্যতম সুন্দর দৃশ্য সৃষ্টি করবে , এমন একটি দৃশ্য যা দশকের পর দশক ধরে লক্ষ লক্ষ মানুষকে আকর্ষণ করেছে।
গ্রিক জাহাজের ইতিহাস ও ভাগ্য
“গ্রিক জাহাজ” নামটি শুনে মনে হলেও এটি গ্রিসে তৈরি হয়নি; বরং এটি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে নির্মিত হয়েছিল। পরে এটি ইংরেজ ও ইরানি মালিকদের হাত ঘুরে এক গ্রীক ব্যবসায়ীর কাছে পৌঁছায়। জাহাজটি ১৯৪৩ সালে (১৩২২ হিজরি শামসি) নির্মিত হয়। নির্মাণের সময় এর ওজন ছিল ৭০৬১ টন এবং দৈর্ঘ্য ছিল ১৩৬ মিটার।
প্রথম মালিক ছিল ব্রিটেনের যুদ্ধ পরিবহন মন্ত্রণালয়, যারা ১৯৪৬ সালে (১৩২৫ হিজরি শামসি) এটি ব্যবহার শুরু করে। তখন জাহাজটির নাম ছিল “এম্পায়ার ট্রাম্পেট”। তিন বছর পর লিভারপুলের “চারনেট স্টিমশিপ কোম্পানি” জাহাজটি কিনে এর নাম দেয় “ন্যাচারালিস্ট”।
পরবর্তীতে ১৯৫৯ সালে (১৩৩৮ হিজরি শামসি) ইংল্যান্ডে বসবাসরত কিছু ইরানি ব্যক্তি জাহাজটি কিনে এর নাম রাখে “কোরুশে পরসি”। পরবর্তী মালিক ছিল ইরানের খোররামশাহরে অবস্থিত একটি শিপিং কোম্পানি, যারা এর নাম পরিবর্তন করে “হামেদান” রাখে।
এই সব হাতবদলের পর শেষ পর্যন্ত জাহাজটি এক গ্রীক ব্যবসায়ীর কাছে যায়, কিন্তু কেউ জানত না তিনি এর শেষ মালিক হবেন। এই ব্যাবসায়ী জাহাজটি কিনেন এবং তিনি জাহাজটির নাম দেন “কোলা এফ” এবং অনেক যাত্রী নিয়ে এটি গ্রিসে যাওয়ার পথে যাত্রা শুরু করে।
কিন্তু ২৬ জুলাই ১৯৬৬ (৪ মোরদাদ, ১৩৪৫ হিজরি শামসি) তারিখে এটি কিশ দ্বীপের পশ্চিমে “বাগু” গ্রামে আটকে যায় (গ্রাউন্ডেড হয়ে যায়)। পরবর্তী দিনগুলোতে জাহাজটিকে উদ্ধার করার অনেক চেষ্টা করা হয়, কিন্তু সফল হয়নি। জাহাজটি ভারী হওয়ায় কাদায় আটকে যায় এবং বের করা সম্ভব হয়নি।
অবশেষে ৮০ দিন পর সবাই জাহাজ উদ্ধার করার আশা ছেড়ে দেয় এবং সেটিকে সেখানেই ফেলে রাখা হয়। বলা হয়, জাহাজটি তখন তেল বহন করছিল।
গ্রিক জাহাজ কেন আটকে গেল?
গ্রিক জাহাজটি কী কারণে চরে আটকে গিয়েছিল, সে বিষয়ে বিভিন্ন মত বা বর্ণনা প্রচলিত রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, মালিক আর্থিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছিলেন এবং বীমার বড় অঙ্কের অর্থ পাওয়ার জন্য জাহাজটি ইচ্ছাকৃতভাবে ডুবিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। অন্যরা মনে করেন এটি নাবিকের ভুলের ফল।
অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, জাহাজটি যখন গ্রিসের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছিল, তখন রাতের অন্ধকারে ঘন কুয়াশার কারণে পথভ্রষ্ট হয়ে দ্বীপের দিকে চলে আসে এবং শেষ পর্যন্ত চরে আটকে যায়।
এই ঘটনার কারণ যাই হোক না কেন, আজ গ্রিক জাহাজটি কিশের সমুদ্রসৈকতের অন্যতম সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান অবস্থা
গ্রিক জাহাজটি চরে আটকে যাওয়ার পর বহু দশক কেটে গেছে। এ সময়ের মধ্যে পারস্য উপসাগরের লবণাক্ত পানিতে এর বিভিন্ন অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে ভেঙে পড়েছে। সম্ভবত আগামী এক-দুই দশকের মধ্যেই বাকি অংশগুলোও নষ্ট হয়ে যাবে এবং এই সুন্দর জাহাজের আর কোনো চিহ্ন অবশিষ্ট থাকবে না।
গ্রিক জাহাজ পরিদর্শন
গ্রিক জাহাজের প্রতি পর্যটকদের আগ্রহের কারণে ধীরে ধীরে এর কাছাকাছি সমুদ্রসৈকতে বিভিন্ন সুবিধা গড়ে উঠেছে। আপনি যদি কিশের এই অংশের সৈকতে যান, তবে সেখানে উট ও ঘোড়ায় চড়ার সুযোগ পাবেন। এছাড়া ৬০ হাজার বর্গমিটার আয়তনের “সূর্যাস্ত সমুদ্রসৈকত পার্ক”, কয়েকটি রেস্তোরাঁ, এবং বেশ কিছু হোটেল ও থাকার জায়গা এই সৈকতের কাছাকাছি অবস্থিত।
| গ্রিক জাহাজ এবং এর আকর্ষণীয় ইতিহাস | |
| হরমোজগান | |
| কিশ দ্বীপ | |
| Registration | No registration |









