তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘর: ‘প্রথমের শহর’-এর ইতিহাস ঘুরে দেখার এক অনন্য সুযোগ।
তাবরিজকে ইরানের অন্যতম অগ্রগামী শহর হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, উদ্ভাবন ও আধুনিক উদ্যোগের সূচনা প্রথম এই শহর থেকেই হয়েছিল। তেমনি একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘর। এটি ইরানের পৌরসভাগুলোর ইতিহাসভিত্তিক প্রথম জাদুঘর, যা শহরের ঐতিহাসিক পৌরসভা ভবন স্থানীয়ভাবে পরিচিত "ঘড়ি টাওয়ার" বা "পৌরসভা টাওয়ার" এর ভেতরে অবস্থিত। ভবনটি শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ঐতিহাসিক পৌরসভা চত্বর (ঘড়ি চত্বর)-এ নির্মিত।
তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘরের ইতিহাস
১৯৩৫ সালে (১৩১৪ হিজরি শামসি) তাবরিজের জন্য একটি নতুন পৌরসভা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু হয়। এ উদ্দেশ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত পরিত্যক্ত নওবর কবরস্থানকে নির্মাণস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। জার্মান প্রকৌশলীদের তত্ত্বাবধানে ভবনটির নির্মাণকাজ চলে টানা ছয় বছর। নির্মাণ শেষে এটি তাবরিজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ভবনে পরিণত হয়।
বর্তমানেও এই ভবনে নগর কর্তৃপক্ষের গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তবে সময়ের সঙ্গে ভবনের বড় একটি অংশ জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশেষ করে এর ভূগর্ভস্থ অংশ এখন তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
জাদুঘরটি ২০০৭ সালে (১৩৮৬ হিজরি শামসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রদর্শনী এলাকার আয়তন প্রায় ৮০০ বর্গমিটার। এখানে শুধু তাবরিজ পৌরসভার ইতিহাস ও ব্যবহৃত বিভিন্ন নিদর্শনই নয়, বরং শহরের সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের মূল্যবান নানা দিকও দর্শনার্থীদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘরের বিভিন্ন প্রদর্শনী কক্ষ
দর্শনার্থীদের জন্য জাদুঘরটিতে বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক প্রদর্শনী কক্ষ রয়েছে। এসব কক্ষে তাবরিজের মেয়রদের দেওয়া বিভিন্ন দেশি-বিদেশি উপহার, চীনা পোর্সেলিনের বাসনপত্র, তাবরিজ নিয়ে লেখা ঐতিহাসিক ভ্রমণকাহিনি এবং শহরের বিখ্যাত পণ্যসম্ভার প্রদর্শন করা হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি প্রদর্শনী কক্ষ হলো-
পুরোনো ক্যামেরা গ্যালারি
ইরানে প্রথম চলচ্চিত্র ও আলোকচিত্রের ক্যামেরা তাবরিজ দিয়েই প্রবেশ করেছিল। সেই ইতিহাসকে তুলে ধরতে এই গ্যালারিতে বিভিন্ন সময়ের চলচ্চিত্র ও স্থিরচিত্র ধারণের নানা ধরনের ক্যামেরা প্রদর্শন করা হয়েছে। এখানে থাকা অধিকাংশ সংগ্রহ তাবরিজের একজন আলোকচিত্রী ও ব্যক্তিগত সংগ্রাহকের দান।
কার্পেট গ্যালারি
তাবরিজের কার্পেট বিশ্বজুড়ে খ্যাত। নান্দনিক নকশা ও সূক্ষ্ম কারুকার্যের জন্য এই কার্পেট যুগ যুগ ধরে ইরানের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই গ্যালারিতে মূল্যবান কার্পেট ও কার্পেটচিত্রের (ট্যাপেস্ট্রি) এক সমৃদ্ধ সংগ্রহ সংরক্ষিত রয়েছে, যার কিছু নিদর্শনের বয়স ৮০ বছরেরও বেশি।
এখানে দর্শনার্থীরা ১১১ বর্গমিটার আয়তনের ইরানের অন্যতম বৃহৎ কার্পেট দেখতে পারেন। এছাড়া ১৯২৩ ও ১৯৪১ সালে বোনা দুটি অত্যন্ত মূল্যবান কার্পেট, যা ‘যমজ বোন’ নামে পরিচিত, এই গ্যালারির অন্যতম আকর্ষণ। এর পাশাপাশি তাবরিজ পৌরসভা ভবনের নির্মাণের বিভিন্ন ধাপকে স্মরণ করে তৈরি ১২টি বিশেষ কার্পেটও এখানে প্রদর্শিত হচ্ছে।
নথিপত্র গ্যালারি
এই গ্যালারিতে তাবরিজ পৌরসভার ইতিহাসসংক্রান্ত বহু দুর্লভ দলিল, নথি ও স্মারক সংরক্ষিত রয়েছে। এখানে পুরোনো বই, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি এবং সরকারি চিঠিপত্র প্রদর্শিত হয়, যা তাবরিজ পৌরসভার কার্যক্রম ও ইতিহাসের নানা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তুলে ধরে।
শব্দ ও সঙ্গীত গ্যালারি
এটি জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণীয় অংশ। এখানে তাবরিজের এক শিল্পীর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে সংগৃহীত নানা নিদর্শন প্রদর্শন করা হয়েছে। গ্যালারিটিতে বিভিন্ন ধরনের ধ্রুপদি, জাতীয় ও লোকবাদ্যযন্ত্রের পাশাপাশি পুরোনো রেডিও, টেলিভিশন এবং টেলিফোনও দেখা যায়।
শহীদ স্মৃতি গ্যালারি
ইরান-ইরাকের আট বছরের যুদ্ধে তাবরিজের বহু মানুষ দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছিলেন। তাঁদের স্মৃতিকে সম্মান জানাতে এই গ্যালারিতে তাবরিজের শহীদদের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত সামগ্রী, আলোকচিত্র, নথি এবং হাতে লেখা স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হয়েছে।
প্রজ্ঞা গ্যালারি
তাবরিজ বহু বিশিষ্ট ধর্মীয় ও জ্ঞানচর্চার ব্যক্তিত্বের জন্মস্থান। এই গ্যালারিতে শহরের তিনজন খ্যাতিমান ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা আমিনি, আল্লামা তাবাতাবায়ি এবং আল্লামা জাফারি এর জীবন, কর্ম ও অবদান তুলে ধরা হয়েছে।
মুদ্রণশিল্প গ্যালারি
ইরানের প্রথম ছাপাখানা তাবরিজেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ঐতিহাসিক ঘটনাকে স্মরণ করে এই গ্যালারিতে ইরানের মুদ্রণশিল্পের ইতিহাস এবং এ শিল্পের বিকাশে তাবরিজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে।
অগ্নিনির্বাপণ গ্যালারি
ইরানের প্রথম অগ্নিনির্বাপণ কেন্দ্রও তাবরিজে প্রতিষ্ঠিত হয়। তাই এই গ্যালারিতে দেশের প্রাথমিক যুগের অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং ফায়ার সার্ভিসের ব্যবহৃত বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপকরণ প্রদর্শন করা হয়েছে।
| তাবরিজ পৌরসভা জাদুঘর: ‘প্রথমের শহর’-এর ইতিহাস ঘুরে দেখার এক অনন্য সুযোগ। | |
| পূর্ব আজারবাইজান | |
| তাবরিজ | |



















