এজেন্সি
মারাগেহর গুহাগুলো; প্রাচীন ইতিহাসে ঘেরা রহস্যময় ও দর্শনীয় স্থান

মারাগেহর গুহাগুলো; প্রাচীন ইতিহাসে ঘেরা রহস্যময় ও দর্শনীয় স্থান

মারাগেহর গুহাগুলো; প্রাচীন ইতিহাসে ঘেরা রহস্যময় ও দর্শনীয় স্থান

গুহাগুলোকে শুধু মাটির নিচে থাকা প্রাকৃতিক ভূ-গঠন হিসেবে দেখা উচিত নয়। মানুষের কাছে গুহার গুরুত্ব অনেক বেশি, কারণ এগুলোই ছিল আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রথম আশ্রয় ও বসতিস্থল। পরবর্তীতে মানুষ যখন ঘরবাড়ি তৈরি করতে শিখল এবং শহর ও গ্রামে বসবাস শুরু করল, তখনও গুহার গুরুত্ব পুরোপুরি কমে যায়নি। অনেক সময় এগুলো পবিত্র স্থান কিংবা মানুষের সমবেত হওয়ার স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। আধুনিক বিশ্বেও গুহার আকর্ষণ অটুট রয়েছে। বিশেষ করে ইতিহাস, প্রকৃতিভ্রমণ ও গুহা অনুসন্ধানে আগ্রহী মানুষের কাছে গুহা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। এমনকি ভৌতিক গল্পের লেখকদের কাছেও গুহা বেশ আকর্ষণীয় স্থান। কারণ স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার পরিবেশের কারণে গুহাকে ভয়ংকর প্রাণী, অশুভ শক্তি ও দানবীয় প্রাণীদের বসবাস ও লুকিয়ে থাকার উপযুক্ত স্থান হিসেবে কল্পনা করা হয়!

বর্তমানে গুহা অনুসন্ধান একটি জনপ্রিয় ও বিশেষায়িত কার্যক্রম, যেখানে খেলাধুলা ও দুঃসাহসিক অভিযানের সমন্বয় ঘটেছে। ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে অসংখ্য গুহা, যা গুহা অনুসন্ধানকারীদের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য হতে পারে। ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মারাগেহ এমনই একটি এলাকা। মনোরম ও আকর্ষণীয় পাহাড়ি ঢালে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য বৈচিত্র্যময় গুহার কারণে মারাগেহ প্রকৃতিপ্রেমী ও গুহা অনুসন্ধানে আগ্রহীদের জন্য একটি উপযুক্ত ও আকর্ষণীয় গন্তব্য।

মারাগেহর গুহা: হামপুইল

হামপুইল গুহা মারাগেহর অন্যতম আকর্ষণীয় ও বিখ্যাত গুহা। এটি গেশায়েশ নামের একটি গ্রামের কাছে অবস্থিত। এই গুহায় কবুতর বাসা বাঁধে ও বসবাস করে বলে স্থানীয় মানুষ একে কবুতরের গুহা নামে ডাকেন।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, এই চুনাপাথরের গুহাটি প্রায় ১৫ কোটি বছর আগে সৃষ্টি হয়েছে। গুহার ভেতরের অংশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। সেখানে বেশ কয়েকটি বড় স্ট্যালাকটাইটস্ট্যালাগমাইট দেখা যায়। গভীর কূপ এবং খাড়া ও ভয়ংকর গর্ত থাকার কারণে হামপুইল গুহায় গুহা অনুসন্ধান করা অত্যন্ত কঠিন। এ জন্য ভালো শারীরিক সক্ষমতার পাশাপাশি উপযুক্ত সরঞ্জামও প্রয়োজন। তবে গুহার যেসব অংশ সহজে পৌঁছানো যায়, সেগুলো প্রকৃতিপ্রেমীদের ঘোরাফেরা ও বিশ্রামের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গুহায় পৌঁছানোর জন্য একটি পথ তৈরি করা হয়েছে। ফলে পর্যটকেরা এখন তুলনামূলকভাবে সহজে গুহাটি পরিদর্শন করতে পারেন। গুহাটি যে পাহাড়ি ঢালে অবস্থিত, তার নিচের দিকে বয়ে চলেছে সুন্দর মারদাগ নদী। নদীটির তুলনায় গুহাটির উচ্চতা প্রায় ,৬০০ মিটার

গুহাটির অন্যতম আকর্ষণীয় নিদর্শন হলো রুশ ভাষায় লেখা একটি শিলালিপি, যেখানে ১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দ তারিখটি দেখা যায়।

হামপুইল গুহা ২০১৫ খ্রিষ্টাব্দে  ইরানের জাতীয় প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

মারাগেহর গুহা: কিরখ কুহুল

গুহায় বসবাসের সময় মানুষ এর আকৃতি ও গঠনে বিভিন্ন পরিবর্তন এনেছে। কিরখ কুহুল বা চল্লিশ গুহা-তে এরই একটি উদাহরণ দেখা যায়। এই গুহাগুলোর সমষ্টি মারাগেহ শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে, মোগানজিক নদীর কাছে অবস্থিত। মোগানজিক গ্রামটি গুহাগুলো থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার এবং কাহজুক গ্রামটি প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে।

গুহাগুলোর মধ্যে খিলানযুক্ত তিনটি কৃত্রিম প্রবেশপথ তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি প্রবেশপথ আলাদা আলাদা কক্ষে গিয়ে শেষ হয়েছে। আবার এসব কক্ষ পরস্পরের সঙ্গে করিডোরের মাধ্যমে যুক্ত। ধারণা করা হয়, এই অঞ্চলে মানুষের বসবাসের ইতিহাস প্রস্তর যুগ পর্যন্ত পৌঁছায়।

মারাগেহর গুহা: চাপার

এই বিশাল চুনাপাথরের গুহাটি মারাগেহ শহরের ১০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে, চোয়ান-এ সুফলা গ্রামের পূর্বদিকে অবস্থিত। ইতিহাসবিদদের মতে, এই গুহাটি একসময় মানুষের বসতিস্থল ছিল এবং ঐতিহাসিকভাবে এর যথেষ্ট গুরুত্ব রয়েছে। এ কারণে গুহাটির বিভিন্ন অংশের মানচিত্র তৈরি ও সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য গবেষণা চালানো হয়েছে। গুহাটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০০ মিটার। এর তিনটি স্তরে ছোট-বড় বিভিন্ন কক্ষ এবং আঁকাবাঁকা অসংখ্য করিডোর দেখা যায়।

মারাগেহর গুহা: মারাগেহ মানমন্দিরের পাহাড়ের গুহাগুলো

এক সময় মারাগেহ ইলখানিদের শাসনের রাজধানী ছিল। এই সময়ে শহরটি শুধু রাজনৈতিকভাবেই গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান-বিজ্ঞান কেন্দ্রেও পরিণত হয়েছিল। মারাগেহ মানমন্দির ছিল সেই সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক স্থাপনা। এখানে একটি বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে উঠেছিল এবং বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী ও পণ্ডিতেরা এখানে এসে গবেষণা করতেন। বর্তমানে মানমন্দিরের ধ্বংসাবশেষ তালেবখান গ্রামের কাছে একটি উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত। এর আশপাশে চুনাপাথরের গঠনের বেশ কয়েকটি গুহা দেখা যায়। অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থাকা সত্ত্বেও এসব গুহা এখনো অনেকটাই অজানা ও অনাবিষ্কৃত রয়ে গেছে।

গুহাগুলোর ভেতরের কিছু অংশ ধনুকের মতো বাঁকানো আকৃতিতে খোদাই করা হয়েছে। ধারণা করা হয়, এসব খোদাইয়ের বয়স ইরানে ইসলামের আগমনেরও আগের, অর্থাৎ খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর পূর্ববর্তী সময়ের। তবে পরবর্তী সময়ে, বিশেষ করে ইলখানি শাসনামলে, এসব গুহায় বিভিন্ন পরিবর্তন আনা হয়েছিল, যাতে এগুলো মানমন্দিরের সহায়ক স্থাপনা হিসেবে ব্যবহার করা যায়। এই গুহাগুলোর সমষ্টি ২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়।

 

মারাগেহর গুহাগুলো; প্রাচীন ইতিহাসে ঘেরা রহস্যময় ও দর্শনীয় স্থান
পূর্ব আজারবাইজান
মারাগেহ
Natural
Registration

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: