এজেন্সি
মরানজাব কারাভানসারাই এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে এর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।

মরানজাব কারাভানসারাই এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে এর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।

মরানজাব কারাভানসারাই এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে এর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।

ইরানের উষ্ণ ও শুষ্ক প্রকৃতির কারণে এখানকার শহর ও জনবসতিগুলোর মধ্যে দূরত্ব অনেক বেশি। আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা চালু হওয়ার আগে, ইরানের এক শহর থেকে অন্য শহর বা জনপদে যাতায়াত করতে কখনো কখনো কয়েক দিন সময় লেগে যেত। এভাবে ভ্রমণ ও বাণিজ্য ছিল একটি কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ; বিশেষ করে যখন পথে এমন সব বিদ্রোহী ও দস্যু দলের আশঙ্কা থাকত, যারা কাফেলার চলাচলের পথে ওত পেতে থেকে তাদের ওপর হামলা ও লুটপাট চালাতে পারত। এই সমস্যাগুলো দূর করার জন্য ইরানিরা যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, তা ছিল যাত্রীদের থাকার ও আরামের জন্য বিশেষ স্থাপনা নির্মাণ করা। বর্তমানে এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক স্থাপনা টিকে আছে এবং এগুলো বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশে পরিণত হয়েছে।

মরানজাব কারাভানসারাই এমনই একটি ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটি ইসফাহান প্রদেশের উত্তরে, মরানজাব নামে পরিচিত একটি অঞ্চলে, ইরানের কেন্দ্রীয় মরুভূমির প্রান্তে এবং লবণ হ্রদের (দরিয়াচে-য়ে নেমক) কাছাকাছি অবস্থিত। এই কারণেই প্রতি বছর বহু পর্যটক মরানজাবে ভ্রমণ করেন কারাভানসারাইটি পরিদর্শন করার জন্য এবং এর চারপাশের নীরব ও মনোমুগ্ধকর মরুপ্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য।

মরানজাব কারাভানসারাইয়ের বৈশিষ্ট্য ও ইতিহাস

মরানজাব কারাভানসারাইয়ের নির্মাণকাল সাফাভি শাসক শাহ আব্বাসের যুগের (১৬শ শতাব্দীর শেষভাগ) সঙ্গে সম্পর্কিত। সে সময় তৎকালীন সরকার কারাভানসারাই নির্মাণের মাধ্যমে বাণিজ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ইরানের অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছিল। সেই সময় আগা খিজর নাহাভান্দি নামের এক ব্যক্তি এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তাঁর নির্দেশে কারাভানসারাইটি নির্মাণ করা হয়, যাতে এটি শুধু কাফেলার জন্য একটি আবাসস্থল হিসেবেই নয়, বরং এলাকার নিরাপত্তা রক্ষার একটি কেন্দ্র হিসেবেও কাজ করতে পারে। মরানজাব কারাভানসারাইয়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়গুলোর একটি হলো সহজে পানির প্রাপ্যতা। আর তা এমন এক উত্তপ্ত মরুভূমির মাঝখানে, যেখানে বছরের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ সময়ে এক ফোঁটা বৃষ্টিও নাও হতে পারে! এই বৈশিষ্ট্যের কারণ হলো, কারাভানসারাইয়ের পাশ দিয়ে প্রবাহিত একটি কানাত (ভূগর্ভস্থ জল সরবরাহ ব্যবস্থা)।

বর্তমানেও কারাভানসারাইয়ের কাছে দুটি অগভীর কূপ দেখা যায়, যেগুলো কারাভানসারাইয়ের দুই পাশে থাকা গাছগুলোকে পানি সরবরাহ করে। কানাতের পানি কাছের একটি জলাধারে জমা হয়। এই কানাতের পানি মিঠা এবং এতে মাছও বসবাস করে। এমন শুষ্ক ও উত্তপ্ত মরুভূমিতে মাছের উপস্থিতি যেকোনো দর্শনার্থীকে বিস্মিত করে। মরুভূমির প্রচণ্ড গরমের কারণে সাধারণত বসন্তের মাঝামাঝি থেকে শরতের মাঝামাঝি পর্যন্ত কারাভানসারাই পরিদর্শন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে বছরের অন্য সময়ে এটি মরুভ্রমণকারী ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য একটি আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়। বিশেষ করে কারাভানসারাইয়ের কাছাকাছি অবস্থিত বালিয়াড়ি ও উঁচু বালুর টিলাগুলো, যেগুলো স্থানীয়রা "বান্দে রিগ" নামে ডাকে, পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। বাতাসের কারণে বালু সরে যাওয়ায় এসব টিলার উচ্চতা পরিবর্তিত হয়। এমনকি একটি উঁচু টিলাও কখনো কখনো এক দিনের মধ্যেই বাতাসের কারণে অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে।

খালি পায়ে এই বালুর ওপর হাঁটার অভিজ্ঞতা অনন্য আনন্দ ও প্রশান্তি এনে দেয়। কারাভানসারাইয়ের আশপাশে উটের পালও দেখা যায়। সাধারণত উটগুলো পানি পান বা খাবারের সন্ধানে মরানজাব কারাভানসারাইয়ের কাছে আসে। অধিকাংশ উটের মালিক রয়েছে এবং তাদের চিহ্নিত করার জন্য বিশেষ চিহ্ন দেওয়া থাকে। কারাভানসারাইয়ের কাছের লবণ হ্রদ (দরিয়াচে-য়ে নেমক) এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। এছাড়া কারাভানসারাই যাওয়ার পথে "দাস্তকান" নামে একটি কূপ রয়েছে, যা প্রাণীদের পানির উৎস হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

মরানজাব মরুভূমিতে বিশেষ কিছু উদ্ভিদ ও প্রাণীর প্রজাতিও বসবাস করে, যেগুলো বৈজ্ঞানিক গবেষণার দৃষ্টিতে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। খাঁজকাটা ও লম্বা আকৃতির কিজ (কিচ) ও তাগ গাছ রাতে ভীতিকর হলেও একই সঙ্গে অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তৈরি করে। মরানজাব কারাভানসারাইয়ের আশপাশের মরুভূমির বনাঞ্চল প্রায় ১২০ হাজার হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এবং এটি মানুষের দ্বারা সৃষ্ট। এই মরুভূমিতে বসবাসকারী প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে টিকটিকি, সাপ, বিচ্ছু, শিয়াল এবং বালুর বিড়াল। এই কারাভানসারাই ও এর আশপাশের অঞ্চল উঁচু পাহাড়ের বাধা এবং আলোকদূষণ থেকে মুক্ত হওয়ায় আকাশ পর্যবেক্ষণ বা নক্ষত্র দেখার জন্য একটি উপযুক্ত স্থান।

মরানজাব কারাভানসারাইয়ের স্থাপত্য

মরানজাব কারাভানসারাইটি একটি বর্গাকার আকৃতিতে নির্মিত এবং এর আয়তন প্রায় ৩,৫০০ বর্গমিটার। কারাভানসারাইটির চারপাশে থাকা ছয়টি প্রহরী টাওয়ার ছিল রক্ষীদের অবস্থানের জন্য নির্ধারিত স্থান। কারাভানসারাইটির আঙিনার আয়তন প্রায় ৬০০ বর্গমিটার এবং এর দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ২০ ও ৩০ মিটার। এখানে মোট ২৯টি কক্ষ নির্মিত হয়েছে। নির্মাণের সময় থেকে বিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত এই কারাভানসারাই তার মূল কার্যকারিতা ধরে রেখেছিল। তবে ধীরে ধীরে নতুন সড়ক নির্মাণ এবং মোটরযানের বিস্তারের কারণে এর গুরুত্ব ও ব্যবহার কমে যায়। গত কয়েক দশকে কারাভানসারাইটির সংস্কারের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারকাজ শুরু হয় ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে (১৩৭৮ হিজরি শামসি) এবং তা চার বছর ধরে চলেছিল।

মরানজাব কারাভানসারাইয়ের জাতীয় ও বিশ্ব নিবন্ধন

মরানজাব কারাভানসারাই ২০০৫ খ্রিস্টাব্দে (১৩৮৪ হিজরি শামসি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকায় নিবন্ধিত হয়। এছাড়াও ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে (১৪০২ হিজরি শামসি) এই কারাভানসারাই ইরানের ৫৪টি কারাভানসারাইয়ের একটি হিসেবে বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

মরানজাব কারাভানসারাই এবং উত্তপ্ত মরুভূমির বুকে এর বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য।
ইসফাহান
আরান ভা বিডগোল
,Natural
RegistrationUnesco,

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: