এজেন্সি
উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর: সমকালীন ইরানের বিখ্যাত কবির জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের এক সুযোগ।

উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর: সমকালীন ইরানের বিখ্যাত কবির জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের এক সুযোগ।

উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর: সমকালীন ইরানের বিখ্যাত কবির জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের এক সুযোগ।

সব জাতিই তাদের কবি ও সাহিত্যিকদের সম্মান করে, কারণ তাঁরা নিজেদের সংস্কৃতি সংরক্ষণ ও সমৃদ্ধ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ইরানেও প্রাচীনকাল থেকেই কবি ও সাহিত্যিকদের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং তাঁরা সবসময় মানুষের শ্রদ্ধার পাত্র হয়ে আসছেন।

ইরানের মহান কবিদের প্রত্যেকের জন্যই জাতীয় ক্যালেন্ডারে বিশেষ স্মরণ দিবস নির্ধারিত আছে। সাধারণত এসব দিনে মানুষ তাঁদের সমাধিস্থলে জড়ো হন এবং তাঁদের সাহিত্যকর্ম ও অবদান স্মরণ করেন।

সমকালীন কবিদের মধ্যেও ইরানে বহু কবি খ্যাতি ও সম্মান অর্জন করেছেন। উস্তাদ শাহরিয়ার তাঁদের অন্যতম। তাবরিজের ‘মাকবারাতুশ শোয়ারা’ (কবিদের সমাধিক্ষেত্র)-এ তাঁর ও কয়েকজন তাবরিজি কবির সম্মানে নির্মিত স্মৃতিসৌধের পাশাপাশি তাঁর নামে একটি জাদুঘরও রয়েছে।

শাহরিয়ার কে ছিলেন?

সৈয়দ মোহাম্মদ হোসেইন বেহজাত তাবরিজি ১৯০৬ সালে (১২৮৫ হিজরি শামসি) তাবরিজ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন আইনজীবীর সন্তান। নিজের কবিতায় তিনি শাহরিয়ার ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। তাঁর বাবা ছিলেন একজন দক্ষ ক্যালিগ্রাফার (সুন্দর হস্তলিপির শিল্পী) এবং সাংবিধানিক আন্দোলনের সময় স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রামেও অংশ নিয়েছিলেন।

১৯২১ সালে (১৩০০ হিজরি শামসি) শাহরিয়ার স্কুলের পড়াশোনা শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য তেহরানে যান। সেখানে তিনি তিন বছর দারুল ফুনুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেন এবং পরে চিকিৎসাবিদ্যার বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বলা হয়, চিকিৎসাশিক্ষা শেষ হতে যখন তাঁর মাত্র সাত মাস বাকি ছিল, তখন তিনি এক তরুণীর প্রেমে পড়েন, কিন্তু তাঁর কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। এই ঘটনা শাহরিয়ারের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। এরপর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে কবিতার জগতে নিজেকে নিয়োজিত করেন।

জীবনের শেষ পর্যন্ত শাহরিয়ার প্রেম, অনুভূতি ও মানবিক আবেগ নিয়ে কবিতা রচনা করেছেন এবং তিনি ইরানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সমকালীন কবি হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হায়দার বাবায়ে সালাম আজারবাইজানি তুর্কি সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি ইরানের জাতীয় অমূর্ত সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায়ও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। শাহরিয়ার ফারসি ধ্রুপদি কবিতার প্রায় সব ধারাতেই উল্লেখযোগ্য রচনা রেখে গেছেন।

১৯৮৮ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর (২৭ শাহরিয়ার ১৩৬৭ হিজরি শামসি) শাহরিয়ার তাবরিজের নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তাঁকে তাবরিজের মাকবারাতুশ শোয়ারা (কবিদের সমাধিক্ষেত্র)-এ, শহরের আরও কয়েকজন কবির সমাধির পাশে সমাহিত করা হয়।

উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর সম্পর্কে

বর্তমানে যে বাড়িটি উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর নামে পরিচিত, সেটিই ছিল তাঁর তৃতীয় বাসভবন। শাহরিয়ার ১৯৬৮ সালে (১৩৪৭ হিজরি শামসি) এই বাড়িটি কিনেছিলেন এবং জীবনের শেষ ২০ বছর এখানে কাটিয়েছেন। এই বাড়িতেই তিনি তাঁর বহু বিখ্যাত কবিতা রচনা করেন এবং ইরানের বহু শিল্পী ও সাহিত্যিক ব্যক্তিত্বকে আতিথ্য দিয়েছেন।

শাহরিয়ারের মৃত্যুর পর তাবরিজ পৌরসভা এই বাড়িটি কিনে জাদুঘরে রূপান্তর করে। জাদুঘরে প্রদর্শিত অধিকাংশ সামগ্রীই শাহরিয়ারের ব্যক্তিগত ব্যবহার্য জিনিসপত্র ও তাঁর হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, যা তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে দান করা হয়েছে। এছাড়া ১৯৯১ সালে (১৩৭০ হিজরি শামসি) শাহরিয়ারের রেখে যাওয়া দলিল ও স্মারক সংগ্রহের জন্য একটি আহ্বান জানানো হয়। এরপর বহু গুরুত্বপূর্ণ নথি ও সামগ্রী জাদুঘরে জমা দেওয়া হয়।

বর্তমানে এই জাদুঘরে উস্তাদ শাহরিয়ারের ব্যবহৃত ৫০০টিরও বেশি ব্যক্তিগত সামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বই, ব্যাগ, লাঠি, প্রকাশিত গ্রন্থ, কবিতার খাতা, হাতে লেখা পাণ্ডুলিপি, শাহরিয়ারের নিজের হাতে নাসখ লিপিতে লেখা কোরআনের একটি কপি, লেখার সামগ্রী, ছবির অ্যালবাম এবং তাঁকে দেওয়া বিভিন্ন উপহার।

এই ছোট বাড়িটির ভূগর্ভস্থ অংশে শাহরিয়ারের জীবনের বিভিন্ন সময়ের ছবি প্রদর্শন করা হয়েছে। সেখানে একটি ছোট জলাধারও রয়েছে, যা পুরো পরিবেশে এক ধরনের কাব্যিক আবহ তৈরি করে। শাহরিয়ার জীবদ্দশায় সেতার বাজাতেন। তাঁর অত্যন্ত প্রিয় সেই বিখ্যাত সেতারটিও জাদুঘরের এই ভূগর্ভস্থ অংশে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হয়েছে।

শাহরিয়ারের বাড়িটি ১৯৫০-এর দশকে (১৩৩০ হিজরি শামসি) নির্মিত হয়েছিল। এর মোট আয়তন প্রায় ২৫০ বর্গমিটার এবং এটি দুই তলা বিশিষ্ট। ২০০৭ সালে (১৩৮৬ হিজরি শামসি) বাড়িটি ইরানের জাতীয় ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর কোথায় অবস্থিত?

এই জাদুঘরটি তাবরিজ শহরের অন্যতম পুরোনো এলাকা মাকসুদিয়া মহল্লায় অবস্থিত। এর আশপাশে বেশ কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বেহনাম হাউস, পরিমাপ জাদুঘর, ঘড়ি টাওয়ার (সাত ভবন) এবং কাদাকি হাউস

তাই দর্শনার্থীরা উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর পরিদর্শনের পাশাপাশি কাছাকাছি অবস্থিত এসব ঐতিহাসিক স্থানও ঘুরে দেখতে পারেন।

উস্তাদ শাহরিয়ার জাদুঘর: সমকালীন ইরানের বিখ্যাত কবির জীবন ও সৃষ্টির সঙ্গে পরিচয়ের এক সুযোগ।
পূর্ব আজারবাইজান
তাবরিজ

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: