বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি যা বাম অঞ্চলের জলপ্রণালিগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ।
জলপ্রণালি খননের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তা হল, ভূমির ঢাল, পানির প্রবাহের পরিমাণ এবং মাটির প্রকৃতি। এই প্রতিটি বিষয়ের জন্য বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন হয়। শত শত বছর আগে এমন জ্ঞান অর্জন ও তার সফল প্রয়োগ প্রাচীন ইরানের মানুষের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির এক উজ্জ্বল নিদর্শন।
ইরানের উষ্ণ ও শুষ্ক অঞ্চলের প্রায় সর্বত্রই জলপ্রণালি নির্মাণের এই প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইরানে খনন করা জলপ্রণালির সংখ্যা ৩০ হাজারেরও বেশি। এত বিপুল সংখ্যক জলপ্রণালি নির্মাণ থেকে বোঝা যায় যে, জলপ্রণালি খননের কৌশল এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশল জ্ঞান দেশজুড়ে ব্যাপকভাবে বিস্তৃত ছিল। একই সঙ্গে এটি প্রাচীন ইরানি স্থাপত্য ও প্রকৌশলবিদ্যার উচ্চ মানেরও সাক্ষ্য বহন করে।
ইরানের প্রতিটি জলপ্রণালিই এই উন্নত জ্ঞানের প্রমাণ বহন করে। এর মধ্যে আকবরআবাদ ও কাসেমআবাদ নামে পরিচিত দুটি জলপ্রণালি যা একসঙ্গে বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি নামে পরিচিত। ইরানি জলপ্রণালি স্থাপত্যের একটি পূর্ণাঙ্গ ও উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এই জলপ্রণালি দুটির নির্মাণশৈলীতে জলপ্রণালি নির্মাতাদের অসাধারণ দক্ষতা, সূক্ষ্ম পরিকল্পনা এবং প্রকৌশল নৈপুণ্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালির ভূগোল ও গঠন
বাম শহর বিশ্বের বৃহত্তম কাঁচামাটির দুর্গ আর্গ-এ বাম–এর জন্য সুপরিচিত। শহরটি বাম সমভূমিতে অবস্থিত, যা একটি মরূদ্যানসদৃশ শুষ্ক অঞ্চল। এখানে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ৬০ মিলিমিটার। এই অঞ্চলে স্থায়ী কোনো ভূপৃষ্ঠস্থ নদী বা জলধারা নেই। তবে বর্ষাকালে পাহাড় থেকে নেমে আসা বৃষ্টির পানি অস্থায়ী জলপ্রবাহ সৃষ্টি করে, যার চিহ্ন আজও বাম সমভূমিতে দেখা যায়।
এই শুষ্ক পরিবেশের কারণে স্থানীয় মানুষ ভূগর্ভস্থ পানিকে কাজে লাগাতে জলপ্রণালি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন এবং শত শত জলপ্রণালি খনন করেন। বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি ও ইরানের কেরমান প্রদেশের বাম জেলার অন্তর্গত বেরাভাত শহরে অবস্থিত। শহরটি বাম থেকে প্রায় ২ কিলোমিটার পূর্বে এবং কেরমান শহর থেকে প্রায় ১৯৯ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত।
এই অঞ্চলটির উত্তর ও দক্ষিণে দুটি পর্বতমালা বিস্তৃত। বাম জেলার দক্ষিণে অবস্থিত জাবাল বারেজ (জেবাল বারেজ) পর্বতমালা থেকে ভূগর্ভস্থ জলাধারগুলোতে পানি সরবরাহ হয়। অন্যদিকে উত্তরের পাহাড়গুলো একটি প্রাকৃতিক বাঁধের মতো কাজ করে, ফলে ভূগর্ভস্থ পানি অঞ্চলটির বাইরে চলে যেতে পারে না।
এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানি এলাকায় অবস্থিত চারটি প্রধান ভূ-ফাটল (ফল্ট) বরাবর বিভক্ত হয়ে জমা হয়। এই ফল্টগুলোই অঞ্চলের জলপ্রণালি গুলোর প্রধান পানির উৎস। প্রাচীনকাল থেকেই স্থানীয় মানুষ এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে অসংখ্য জলপ্রণালি নির্মাণ করেন। এ কারণেই অনেক বিশেষজ্ঞ বামের ভূতাত্ত্বিক অববাহিকাকে ইরানের সবচেয়ে ঘন জলপ্রণালি সমৃদ্ধ অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করেন।
বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি র ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য
বাম অঞ্চলে বিদ্যমান ৩৭৫টি জলপ্রণালি পথের মধ্যে ১১৮টি বাম বেরাভাত এলাকায় অবস্থিত। এসব জলপ্রণালি পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে, প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহের পথ অনুসরণ করে বিস্তৃত হয়েছে।
এই জলপ্রণালিগুলোর অনেকগুলো, বিশেষ করে আকবরআবাদ ও কাসেমআবাদ জলপ্রণালি, আজও সক্রিয়ভাবে পানি সরবরাহ করছে। এগুলো এমন এক কৃষি ও বসতির ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রেখেছে, যা দুই হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে এই ভূগর্ভস্থ জলপ্রণালির ওপর নির্ভরশীল।
আকবরআবাদ জলপ্রণালির পানিপ্রবাহের হার প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ৮ লিটার, আর কাসেমআবাদ জলপ্রণালিতে তা প্রায় ১৩৯ লিটার। এ কারণে এই দুটি জলপ্রণালিকে অঞ্চলের সবচেয়ে পানিসমৃদ্ধ জলপ্রণালিগুলোর মধ্যে গণ্য করা হয়।
আকবরআবাদ জলপ্রণালির দৈর্ঘ্য প্রায় ১,১০০ মিটার এবং এর পথে ৩৫টি উল্লম্ব কূপ খনন করা হয়েছে। এর প্রধান কূপ বা মাদার কূপের গভীরতা ৭ মিটার এবং সেখান থেকে জলপ্রণালির মুখ বা পানির নির্গমনস্থলের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার। এই জলপ্রণালির পানি ব্যবহার করে নিম্নাঞ্চলের প্রায় ১৬ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে কাসেমআবাদ জলপ্রণালির প্রধান কূপের গভীরতা ৪৪ মিটার এবং প্রধান কূপ থেকে নির্গমনস্থলের দূরত্ব প্রায় ৩০০ মিটার। এই জলপ্রণালির পানি দিয়ে প্রায় ১০০ হেক্টর কৃষিজমি ও ফলের বাগানে সেচের ব্যবস্থা করা হয়।
যদিও এই অঞ্চলটি একাধিক ভূ-ফাটলের ওপর অবস্থিত এবং এখানে ২০০৩ সালের (১৩৮২ হিজরি শামসি) বিধ্বংসী বাম ভূমিকম্প-সহ বহু শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছে, তবুও এই জলপ্রণালিগুলোর মূল কাঠামো আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত ও কার্যকর রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালির বয়স আনুমানিক ২,০০০ থেকে ২,৫০০ বছর, যা এগুলোকে ইরানের প্রাচীন জলপ্রকৌশল ঐতিহ্যের অন্যতম মূল্যবান নিদর্শনে পরিণত করেছে।
বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালির বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি
২০১৬ সালে (১৩৯৫ হিজরি শামসি) ইরানের ১১টি জলপ্রণালি ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এই জলপ্রণালিগুলোর বয়স আনুমানিক ২০০ থেকে ২,৫০০ বছর এবং এগুলো ইরানের প্রাচীন জলপ্রকৌশলের বিভিন্ন প্রযুক্তিগত বৈশিষ্ট্যের প্রতিনিধিত্ব করে।
এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয় আকবরআবাদ ও কাসেমআবাদ জলপ্রণালি যা একসঙ্গে বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি নামে পরিচিত । এই জলপ্রণালি দুটির অনন্য যমজ কাঠামো ছিল বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ। এই বিশেষ প্রকৌশল নকশাই ইউনেস্কোর বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং এগুলোকে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এর আগে, আকবরআবাদ জলপ্রণালি ২০১৪ সালে (১৩৯৩ হিজরি শামসি) ইরানের জাতীয় ঐতিহ্য তালিকায় নিবন্ধিত হয়।
| বেরাভাতের যমজ জলপ্রণালি যা বাম অঞ্চলের জলপ্রণালিগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ। | |
| কেরমান | |
| ব্যাম | |
| Registration | Unesco |



