এজেন্সি
তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘর: একটি প্রাচীন কবরস্থানে ভ্রমণ

তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘর: একটি প্রাচীন কবরস্থানে ভ্রমণ

তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘর: একটি প্রাচীন কবরস্থানে ভ্রমণ

তাবরিজে এই অঞ্চলের কয়েক হাজার বছরের মানবজীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরার জন্য বেশ কিছু জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যার মধ্যে লৌহযুগের জাদুঘর অন্যতম। এটি একটি প্রাচীন কবরসমষ্টি নিয়ে গঠিত জাদুঘর, যেখানে ভ্রমণকারীরা একটি বিশেষ ও ভিন্নধর্মী পরিবেশের অভিজ্ঞতা লাভ করেন।

লৌহযুগের জাদুঘরটি তাবরিজের নীল মসজিদ (মসজিদে কাবুদ)-এর কাছে অবস্থিত। এখানে প্রদর্শিত কবর ও প্রত্নবস্তুগুলোর বয়স প্রায় ৩৫০০ বছর এবং এগুলো লৌহযুগের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণেই এই জাদুঘরের নাম রাখা হয়েছে লৌহযুগের জাদুঘর

এই জাদুঘরটি ২০০০ খ্রিস্টাব্দে জাতীয় ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন হিসেবে নিবন্ধিত হয়। লৌহযুগ বলতে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত একটি ঐতিহাসিক সময়কালকে বোঝানো হয়।

লৌহযুগ ও এর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্য

লৌহযুগ হলো প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিভাজনের তৃতীয় ও সর্বশেষ পর্যায়। এই সময়কাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সাল থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত।

লোহার আকরিক থেকে লোহা তৈরি করা সহজ ছিল না, কারণ এতে প্রচুর পরিমাণে অপদ্রব্য থাকত এবং তা প্রক্রিয়াজাত করতে বিশেষ জ্ঞান ও দক্ষতার প্রয়োজন হতো। নির্মাণকাজের পাশাপাশি যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতেও এই গুরুত্বপূর্ণ ধাতুর ব্যবহার ছিল। তাই লোহা গলানোর প্রযুক্তি ও লোহার সরঞ্জাম তৈরির জ্ঞান অর্জন প্রাচীন সভ্যতাগুলোর রাষ্ট্রক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বিবেচিত হতো।

তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘরের বাহ্যিক ও স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে মাটি খননের কাজ চলাকালে ৩৮টি প্রাচীন কবরের একটি সমষ্টি আবিষ্কৃত হয়। ২০০৬ খ্রিস্টাব্দে ইরানের প্রথম উন্মুক্ত প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর হিসেবে লৌহযুগের জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং এক বছর পর এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

এখানে মৃতদেহগুলো একটি টিলার মতো উঁচু স্থানে সমাহিত করা হয়েছিল। তাই বিভিন্ন কবরের গভীরতা একে অপরের থেকে ভিন্ন। জাদুঘরের নকশা এমনভাবে করা হয়েছে যে দর্শনার্থীদের চলাচলের পথ সমাধিস্থলের তুলনায় নিচু অবস্থানে রয়েছে। এর ফলে প্রাচীন সমাধি ও অবশিষ্টাংশগুলো সহজে দেখা যায়।

একটি ছোট দরজা দিয়ে জাদুঘরে প্রবেশ করতে হয়। এরপর কয়েকটি সিঁড়ি দর্শনার্থীদের মূল প্রদর্শনীস্থলের দিকে নিয়ে যায়। জাদুঘরটি মাটির প্রায় ৮ মিটার গভীরে অবস্থিত একটি অন্ধকার স্থান, যেখানে বিভিন্ন জায়গায় ছোট কাঠের সিঁড়ি এবং কাদামাটির দেয়াল দেখা যায়।

নদীর প্রবাহপথের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে জাদুঘরের ভেতরের বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকে। পরিবেশের আর্দ্রতা কমানোর জন্য এখানে কয়েকটি বায়ু চলাচল ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়েছে।

তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘরের বিভাগসমূহ

জাদুঘরের প্রথম অংশে রয়েছে আবিষ্কৃত প্রাচীন কবরগুলো। বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি সমাধিতে থাকা মৃতদেহের বয়স ও লিঙ্গ নির্ধারণ করে তা সংশ্লিষ্ট কবরের পাশে উল্লেখ করেছেন। এই কবরস্থানে মৃতদেহ সমাহিত করার একটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো মৃতদেহগুলোর অবস্থান।

সেই সময়ের মানুষ বিশ্বাস করত, মানুষকে যেভাবে জন্মগ্রহণ করে, সেভাবেই তাকে সমাহিত করা উচিত। এ কারণে তারা মৃতদেহগুলোকে ভ্রূণের আকৃতিতে কবর দিত। তবে সব মৃতদেহের মধ্যে একটি দেহ এভাবে সমাহিত করা হয়নি। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এই দেহটি এমনভাবে সমাহিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নমনীয়তা ধারণ করত না।

শিশুদের কবরগুলো সাধারণত দেখতে সরল এবং আকারে ছোট। আবার কিছু কবর, যা কিশোরদের বলে ধারণা করা হয়, সেগুলো বর্গাকার আকৃতির। এই সংগ্রহের অধিকাংশ কবরই অল্পবয়সী মানুষের।

জাদুঘরের আরেকটি অংশে এখানে আবিষ্কৃত কবরগুলো থেকে পাওয়া প্রত্নবস্তু সংগ্রহ করে রাখা হয়েছে। এসব বস্তুগুলোর অধিকাংশই হলো মাটির তৈরি পাত্র, যেগুলো মৃতদেহের সঙ্গে কবর দেওয়া হয়েছিল। প্রতিটি কবরেই সেখানে সমাহিত ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু নির্দিষ্ট সামগ্রী রাখা ছিল।

যেমন শিশুদের সঙ্গে খেলনা, নারীদের সঙ্গে অলংকার এবং পুরুষদের সঙ্গে যুদ্ধের সরঞ্জাম কবর দেওয়া হতো। সাধারণত যেসব ব্যক্তি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন, তাঁদের কবরের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক সামগ্রী রাখা হয়েছে।

যদিও নারীদের বাম পাশে এবং পুরুষদের ডান পাশে শোয়ানো অবস্থায় সমাহিত করা হয়েছে, তবে সব মৃতদেহের মুখ উত্তর দিকে রাখা হয়েছে। সেই সময়ের মানুষের মিত্রবাদ (মেহরপূজা) বিশ্বাসের কারণে এই সমাধি-পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল।

মৃতদেহগুলোর চারপাশের দেয়াল বিশেষ পদ্ধতিতে পাথর দিয়ে সাজানো হয়েছে, যা সম্ভবত মাতৃগর্ভের প্রতীক ছিল। কবর থেকে পাওয়া নিদর্শনগুলো দেখে বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন যে, অন্তত কিছু মৃতদেহ যাযাবর জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং অন্য কোনো স্থানে দাফনের পর সেগুলো এখানে স্থানান্তর করা হয়েছিল।

এই স্থানান্তরের সময় কিছু মৃতদেহের যথেষ্ট ক্ষতি হয়েছিল। তবে এ ধরনের স্থান পরিবর্তনও প্রমাণ করে যে, সেই সময়ের মানুষের কাছে এই স্থানটির বিশেষ গুরুত্ব ছিল।

তাবরিজের লৌহযুগের জাদুঘর: একটি প্রাচীন কবরস্থানে ভ্রমণ
পূর্ব আজারবাইজান
তাবরিজ

ইসলামিক কালচার অ্যান্ড কমিউনিকেশন অর্গানাইজেশন হল ইরানি সংস্থাগুলির মধ্যে একটি যেটি সংস্কৃতি ও ইসলামিক গাইডেন্স মন্ত্রণালয়ের সাথে অধিভুক্ত; এবং 1995 সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।[আরও]

:

:

:

: