• Jul 21 2026 - 07:53
  • 9
  • : 3 minute(s)
ইরানের প্রতিনিধি: সংস্কৃতি ও বিশ্বাসই ছিল আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র

আমরা বিশ্বাস করি, যারা সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, তারা প্রকৃত অর্থে কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। এই বিশ্বাস মানুষকে সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি জোগায়।

ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে বৈঠকে সাম্প্রতিক সংঘাত নিয়ে আলোচনা করেন এবং বাংলাদেশ-ইরানের মধ্যে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের প্রস্তাব দেন ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলর।

cddd9699988ae32a22191a2627959541-6a5e4d6903d8e

বাংলাদেশে নিযুক্ত ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলর বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানের টিকে থাকার সক্ষমতা কেবল সামরিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল ছিল না; বরং এর পেছনে ছিল দেশের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের দৃঢ় ভিত্তি। একই সঙ্গে তিনি ঢাকা ট্রিবিউন কার্যালয় সফরকালে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে গণমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।

সোমবার ঢাকা ট্রিবিউনের সম্পাদক রিয়াজ আহমেদ ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে ইরানের সাংস্কৃতিক কাউন্সেলর মাহদি মৌলায়ী আরানি সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাত, সংঘাত মোকাবিলায় ইরানের অভ্যন্তরীণ প্রতিক্রিয়া, যুদ্ধের সময় জাতীয় পরিচয়ের ভূমিকা এবং জাতিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করেন।

বৈঠকে বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্কের বাইরেও সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

উভয় পক্ষ নীতিগতভাবে জ্ঞান বিনিময়, গণমাধ্যমে সহযোগিতা এবং দুই দেশের ইতিহাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও পর্যটনকে তুলে ধরতে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের বিষয়ে সম্মত হয়।

তারা আরও জোর দিয়ে বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে এবং বিভিন্ন দেশের সম্পর্কে বিদ্যমান ভুল ধারণা দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সাম্প্রতিক সংঘাত প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মৌলায়ী বলেন, অনেক আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ইরানের দৃঢ়তা ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে মূলত দেশটির সামরিক শক্তিকেই গুরুত্ব দিয়েছেন।

তবে তার মতে, এ ধরনের ব্যাখ্যা ইরানের গভীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে উপেক্ষা করে।

তিনি বলেন, “অনেকেই জানতে চান, কীভাবে ইরান বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দুটি সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে, যদিও তারা তাদের কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডারকে হারিয়েছে।”

এর উত্তর শুধু সামরিক সক্ষমতার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যাবে না।

মৌলায়ীর মতে, অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাধারণ ইরানিদের সংঘাতের সময় ভীত ও মনোবলহীন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছিল।

তিনি দাবি করেন, দেশের ভেতরের বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, “অনেক যুদ্ধে মানুষ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়, সরকার স্থানান্তরিত হয় এবং সমাজে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।”

“কিন্তু ইরানে আমরা ঠিক উল্টো চিত্র দেখেছি। সংহতি প্রকাশ করতে বিদেশে বসবাসকারী বহু ইরানি দেশে ফিরে এসেছেন এবং মানুষ নিজেদের সম্প্রদায় ছেড়ে পালিয়ে না গিয়ে উদ্ধারকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন।”

ইরানের এই দূত বলেন, এই দৃঢ়তার উৎস হলো দেশের তথাকথিত সফট পাওয়ার বা নরম শক্তি যার মধ্যে রয়েছে এর ইতিহাস, সংস্কৃতি, জাতীয় পরিচয় এবং ধর্মীয় বিশ্বাস।

তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা প্রায়ই হার্ড পাওয়ার (কঠোর বা সামরিক শক্তি) এবং সফট পাওয়ার (নরম শক্তি)-এর মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরতেন। তার মতে, সামরিক সক্ষমতা জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য অপরিহার্য হলেও, একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার ভিত্তি হলো জনগণের শক্তি, তাদের ঐতিহাসিক চেতনা এবং অভিন্ন বিশ্বাস।

মৌলায়ী  বলেন, ইরানের ইতিহাসও এই উপলব্ধিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নিরপেক্ষতা ঘোষণা করার পরও দেশটি দখল হওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইরানিরা সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছে যে, শুধু অস্ত্র কোনো দেশের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে পারে না। তিনি আরও বলেন, জনসাধারণের দৃঢ়তা গড়ে তুলতে ধর্মও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

কোরআনের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর শিক্ষার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, অনেক ইরানি বিশ্বাস করেন যে সংখ্যাগত বা সামরিক শ্রেষ্ঠত্বই শেষ পর্যন্ত কোনো সংঘাতের ফল নির্ধারণ করে না।

তিনি বলেন, আমরা বিশ্বাস করি, যারা সত্যের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন, তারা প্রকৃত অর্থে কখনো মৃত্যুবরণ করেন না। এই বিশ্বাস মানুষকে সবচেয়ে কঠিন সময়েও শক্তি জোগায়।

মৌলায়ী  ইরানের জাতীয় পরিচয় গঠনে ফারসি সাহিত্যের অবদানের কথাও তুলে ধরেন। তিনি আবুল কাসেম ফেরদৌসীর মহাকাব্য শাহনামা-কে ইরানের সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, এই মহাকাব্য আজও প্রজন্মের পর প্রজন্ম দেশপ্রেম, জাতীয় ঐক্য এবং আত্মত্যাগের চেতনাকে অনুপ্রাণিত করে। পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও ইরানের মধ্যে শতাব্দীব্যাপী ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক রয়েছে।

পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে মোলায়ি বলেন, ইরান যুদ্ধকে কোনো সমাধান হিসেবে দেখে না এবং এখনো ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাপূর্ণ শান্তি-র পক্ষেই অবস্থান করছে।

তবে তিনি বলেন, বাইরের চাপের মাধ্যমে চাপিয়ে দেওয়া শান্তি কখনোই টেকসই হতে পারে না। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদার নীতিগুলো কোনোভাবেই আপসযোগ্য নয়।

আলোচনার সমাপ্তিতে মৌলায়ী পুনরায় বলেন, ইরানের দৃঢ়তাকে শুধু সামরিক শক্তির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয়।

তিনি বলেন, “যে জাতি তার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, তাকে সহজে পরাজিত করা যায় না।”

বৈঠকের শেষে উভয় পক্ষ আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশ ও ইরানের গণমাধ্যমের মধ্যে আরও ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা দুই দেশের সমাজ সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া গভীর করতে এবং অভিন্ন ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পর্যটন-সম্পর্কিত সম্পর্ককে আরও সমৃদ্ধ করতে সহায়ক হবে।

Dhaka Bangladesh

Dhaka Bangladesh

.

:

:

:

: